মাস্টারমশাই

শিল্পী: কাতসুশিকা হোকুসাই

আচার্য হরিপদ শাসমল
স্বপন পান্ডা

উনিশ শ চুয়াত্তর। বাহান্ন বছর আগে, অজ পাড়াগাঁ থেকে মুখচোরা, সংকোচে সদা-বিহ্বল এক কিশোর, ক্লাস নাইনে ভর্তিহল এগরা ঝাটুলাল উচ্চবিদ্যালয়ে। শহর থেকে দু-আড়াই মাইল দূরের গ্রামদেশ থেকে, বুকে বইখাতা চেপে খালি পায়ে সে হেঁটে আসে।অবাক-বিস্ময়ে দেখে, কৃষ্ণসায়র দীঘির রহস্যময় গভীর কালো জলের ওপারে ইংরেজি লম্বা বিশাল এল-এর মতো ছড়িয়ে, দাঁড়িয়ে আছে শ্বেতশুভ্র ঝাটুলালের ভবন। গেট দিয়ে ঢুকে লাল মোরামের রাস্তা সোজা চলে গেছে ইস্কুল-দালানে। ক্লাস শুরু হলে, বন্ধুরা বলাবলি করে, কাল এইচ এসের ক্লাস। অবশেষে তিনি এলেন। বাংলার প্রবাদ-প্রতিম শিক্ষক হরিপদ শাসমল।
          শহরের ছেলেরা বলে এইচ এস; আমরা বলি হরিপদ স্যার। তখনও দেখা হয়নি, অথচ তাঁকে নিয়ে গল্পগাছা কত না শোনা হয়ে গেল! বাড়ি তাঁর কাঁথি-রামনগর এলাকার কালিন্দী। ‘কাইগো বাবুহর, আমি হরিপদ আসছি’ বলেই এগরা শহরের, শহর-সংলগ্ন যে-কোনও জনপদের যে-কোনও বাড়ির দাওয়ায় মাদুর টেনে বসে পড়েন। সদরে অন্তঃপুরে এই ‘নিরহং’ শিক্ষকের হঠাৎ আবির্ভাবে পরিবারে, মহল্লায় আলোড়ন জাগে। শুনতে পাই, নোয়াখালি না কোথায় যেন, দাঙ্গার সময়, লেখাপড়া ছেড়ে দিয়ে গান্ধিজির সঙ্গে শান্তিযাত্রায় চলে গিয়েছিলেন। ফিরে এসে লেখাপড়া শেষ করে নানা জায়গায় ঘুরে থিতু হয়েছেন এগরায়। গত পনেরো বছরে আর কোথাও যাননি, একেবারে জড়িয়ে পড়েছেন। এগরায় কলেজ গড়ে ওঠার সময় দোরে দোরে ঘুরে অর্থসংগ্রহ করেছেন, বিনা দক্ষিণায় কলেজে সাহিত্যের ক্লাসও নিয়েছেন গড়ে ওঠার কালে।
          গেরুয়া পাঞ্জাবি খদ্দরের ধুতিতে নাতিদীর্ঘ গৌরবর্ণ, একটু গোলগাল মানুষটি স্কুলের দক্ষিণ-পূর্বকোণে ছাত্রাবাসে নিজের ঘরটি থেকে বেরিয়ে, স্টাফ রুম হয়ে, ধীর পায়ে উঠে এলেন দোতলায়, ছেলেরা বারান্দা থেকে হুড়মুড়িয়ে ঢুকতে থাকে ক্লাসে… খুবই কি কড়া ধাঁচের মাস্টারমশাই নাকি! গ্রাম্য কিশোরের সব ভয় সব সংকোচ মাত্র পঁয়তাল্লিশ মিনিটের কবিতার ক্লাসে উবে যায়। সনেট কাকে বলে, কী হয় তার ধরন-গড়ন, এসব ভূমিকার পর শুরু হয়, মধুসূদনের ‘হে বঙ্গ ভান্ডারে তব…’। ‘যা রে বাছা’ বলে যখন বঙ্গজননী, কবিকে স্নেহময় নির্দেশ দেন, এই জায়গাটিতে তাঁর কণ্ঠে ভর করেন স্বয়ং বঙ্গজননী, আবার ‘পালিলাম আজ্ঞা সুখে’-তে ফেরা মাত্র এক অকৃতী অধম সন্তানের গলায় জাগিয়ে তোলেন গভীর আক্ষেপ ও অশেষ প্রত্যয়ের সুর। সেই প্রথম কবিতাকে ভালোবাসা, সেই প্রথম মধুসূদনের সঙ্গে বন্ধুসম্মিত আলাপ। দু বছর পর তিনিই মধুক্ষরা পদাবলীর অন্দরে নিয়ে গেলেন, ‘তাতল সৈকতে বারি বিন্দুসম সুত মিত রমণী সমাজে’, শোনালেন মৈথিল কোকিলের জীবনপ্রান্তের সঘন হাহাকার। দিনে দিনে তিনি এমন কত কবিতার ভেতর মহলে হাত ধরে ধরে নিয়ে যেতে লাগলেন, কবিতার শব্দে শব্দে এত ‘ঘনযামিনী’র আলো ছড়িয়ে আছে! তাঁর ক্লাসে না বসলে জানাই হত না।
          রবীন্দ্রনাথের দাদাঠাকুরের মতো কচি-কাঁচাদের মাথা ঘুরিয়ে মাতিয়ে মজিয়ে দেবার ব্রত ছিল তাঁর। কৃষ্ণসায়র দীঘির পাড় ধরে হেঁটে আসছেন, সামনে পেছনে যেন পঞ্চকের দল! স্কুলের মহাপঞ্চকের উচ্চাসনে যিনিই বসুন না কেন, খাপছাড়া, আপনহারা মানুষটিকে কেউ কখনও শৃঙ্খলে বাঁধবার চেষ্টাও করেননি। সন্ধ্যায় ক্লাসরুম ছাপিয়ে ছেলেরা এসে পড়ে তাঁর ঘরে। তাদের হাবিজাবি কাঁচা লেখার বদলে দেন শব্দ, বানান ঠিক করে দেন, হোঁচট খাওয়া ছন্দকে দাঁড় করিয়ে দেন। কীভাবে যেন সবাই জেনে যাই, নিভৃতে তিনি কৃষ্ণানন্দ ব্রহ্মচারী নামে কবিতাও লেখেন, কবি তিনি! মনে পড়ে, একটি কবিতায় স্যার চেয়েছিলেন, রঞ্জন ও নন্দিনীর আবির্ভাব। কারণ, ‘আমরা’ আজও –

রঞ্জন হয়ে পারিনি রাঙাতে মাটি ও মানব মন,
নন্দিনী নাই ধরিত্রী তাই তুলিতেছে ক্রন্দন।।

তাঁর আক্ষেপ:

বিভেদের ছোরা রক্তে হাসিছে
দেশের এ মাটি ঘুমে ভিজে আছে

পঙ্‌ক্তিগুলি আজও যে কতখানি প্রাসঙ্গিক!
          হরিপদ স্যারের সঙ্গে শেষ দেখা উনিশ শ আশি-তে, ঠিক ছেচল্লিশ বছর আগে। পাঁচ বছর পর, পঁচাশি সালে তিনি চলে গেলেন। মনের মধ্যে আজও বয়ে নিয়ে চলেছি ‘আচার্যর ভদ্রাসন’। সবার জন্য উন্মুক্ত তাঁর দীক্ষাসত্রে, কোথাও ছিল না গুরুগিরি বা হুকুমনামা; সকলই বন্ধুর মতো, সখার মতো … সারাজীবনে, আচার্যর সঙ্গে তুলনা করব এমন কাউকে আর দেখলাম কই!

শৌটীরবাবু
অমিতকুমার ঘোষ

অবসরপ্রাপ্ত বিভাগীয় প্রধান। রাশিবিজ্ঞান বিভাগ, সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ, কলকাতা।

গোড়ায় দুটো কথা বলে নেওয়া ভাল। প্রয়াত অধ্যাপক শৌটীর কিশোর চট্টোপাধ্যায় জ্ঞানে, কর্মে, মনস্বিতায় ও সহৃদয় ব্যক্তিত্বে সমুজ্জ্বল এমন একজন মানুষ, যাঁর স্মৃতিচারণ দুরূহ কাজ। দ্বিতীয়ত, রাশিবিজ্ঞানের বিস্তৃত ক্ষেত্রে তাঁর অবাধ বিচরণ ও স্মরণীয় অবদান সম্বন্ধে আমার জ্ঞান বড় সীমিত। তাঁর সুযোগ্য সহ-অধ্যাপকমণ্ডলী ও কৃতী, গবেষক ছাত্রছাত্রীরাই এই বিষয়ের বিচার বিশ্লেষণের যথার্থ অধিকারী।
          নানা কাজে, নানা সময়ে শৌটীরবাবুর সান্নিধ্যে যাঁদের আসার সৌভাগ্য হয়েছিল, তাঁরা বুঝেছেন – পাণ্ডিত্য ও বৈদগ্ধের প্রভেদ কোথায় – কোথায় প্রভেদ বুদ্ধি ও প্রজ্ঞায়, কর্মে ও অনুশীলনে, বিদ্যাচর্চা ও সারস্বত সাধনায়। রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, এই প্রভেদজ্ঞানই যথার্থশিক্ষা।
          একদা শান্তিনিকেতন আশ্রমে পণ্ডিত ক্ষিতিমোহন সেন, অথবা, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গনে আচার্য সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায়, ডঃ শশিভূষণ দাশগুপ্ত, আচার্য সত্যেন্দ্রনাথ বসু প্রমুখ স্বনামধন্য শিক্ষকরা অধ্যাপনা-গবেষণার যুগ্ম ধারার ক্ষেত্রে যে মরমী বঙ্গীয় ঐতিহ্যের জন্ম দিয়েছিলেন – নিঃসংশয়ে বলা যায়, সাম্প্রতিক কালে সেই ঘরানারই অন্যতম উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক ছিলেন SKC। মনীষার নিত্য বর্ষণে, স্মিত হাস্যে, মৃদু আলাপচারিতায় ও অনাড়ম্বর জীবনশৈলীতে সতত উজ্জীবিত করে গেছেন সহকর্মী, গবেষক ও ছাত্রছাত্রীদের।
          ‘সহবত’ শব্দটি বাংলা ভাষায় সুপ্রচলিত, যদিও এটি আরবি শব্দ। আভিধানিক অর্থ: ব্যক্তির সান্নিধ্য বা সংসর্গ–জনিত প্রত্যক্ষ শিক্ষা। ভারতবর্ষের চিরায়ত ঐতিহ্য অনুসারে – যথার্থ সারস্বত সাধনায় যোগ্য পথ-প্রদর্শক তিনিই হন, যিনি তত্ত্বচর্চা ও জীবনযাপন এই দুই মার্গকে অভেদ জ্ঞান করেন। উভয় ক্ষেত্রেই তাঁর তন্ময়তা শিক্ষার্থীদের একাধারে ঋদ্ধ ও মুগ্ধ করে। SKC-র সারস্বত সাধনা এই গোত্রের।
          যে কোনও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের বিচারে, শৌটীরবাবুর গভীর মনঃসংযোগ ও অনুপুঙ্খ বিচারের রীতিটির সঙ্গে আমাদের সকলেরই অল্প-বিস্তর পরিচয় আছে। তবে, এক্ষেত্রে তাঁর স্বকীয়তার বিশেষ পরিচয় মেলে – বিচার্য প্রশ্নটিকে গোড়াতেই, তার পরিপ্রেক্ষিতে উপস্থাপনার আশ্চর্য ক্ষমতায়। তখন, পরবর্তী ধাপে সমাধান সূত্রের অন্বেষণ অনেক সহজসাধ্য হয়ে ওঠে। বিশিষ্ট কোয়ান্টাম পদার্থবিদ রিচার্ড ফাইনম্যান তাঁর ছাত্রদের বলতেন, কোনও প্রশ্নের নিখুঁত উপস্থাপনাই, তার সমাধান প্রক্রিয়ার পঞ্চাশ শতাংশ। প্রথমটি উৎসারিত হয় intuition থেকে। আর দ্বিতীয়টি প্রসৃত হয় intelligence থেকে। এই অভিজ্ঞা আমাদের অন্তরে সঞ্চারিত করার মহৎ সাধনায় ব্রতী ছিলেন পরম শিক্ষক শৌটীর কিশোর চট্টোপাধ্যায়।
          মনীষার একটি সাধারণ লক্ষণ হল, জ্ঞানের বিশেষ শাখার সীমানাকে প্রশ্ন করা ও প্রয়োজন বোধে তাকে অতিক্রম করে যাওয়া – সমন্বয়ের বৃহত্তর স্বার্থে। এই প্রসঙ্গে শৌটীরবাবুর শেষের দিকের গবেষণামূলক একটি গ্রন্থের উল্লেখ করা যেতে পারে – যেখানে তিনি পরীক্ষা করেছেন, বেদান্ত দর্শনের ‘চৈতন্যরূপী’ মানুষের সংজ্ঞার প্রেক্ষিতে ও রাশিবিজ্ঞানের ভিত্তিতে এক ভিন্নমাত্রার ‘মানব-উন্নয়ন সূচক’ নির্মাণের বিষয়টি। সম্ভবত নৈয়ায়িক ও বৈদান্তিক মননের সমন্বয় সাধনের এক অভিনব প্রয়াস হিসেবে এই পরীক্ষাটিকে দেখা যেতে পারে।
          ২০০৩ সালে অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস থেকে প্রকাশিত হয় SKC-র Statistical Thought: A History and Perspective গ্রন্থটি। রজার পেনরোজ, স্টিফেন হকিং প্রমুখ বিশিষ্ট আধুনিক বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন যে, যথার্থ দার্শনিকের দৃষ্টিকোণ ছাড়া বিজ্ঞানের ইতিহাস রচনা, পঞ্জিকার শুষ্ক দিনলিপি হয়ে উঠতে পারে। সেদিক থেকে, এই ইতিহাস গ্রন্থটি অবশ্যই ব্যতিক্রমী রচনা। ওই সময় যাঁরা তাঁর সংস্পর্শে এসেছেন, তাঁরা জানেন, কী গভীর অধ্যবসায় ও মননের ফসল এই আকর গ্রন্থটি। বিজ্ঞানের নানা শাখা, গণিতশাস্ত্র ও নানাবিধ অবেক্ষণের জঠরে রাশিবিজ্ঞানের যে ভ্রুণ সৃষ্টি হয়েছিল – তা কীভাবে, কয়েক শতাব্দীর ব্যবধানে, নাড়ি ছিন্ন করে, শিশু আকারে ভূমিষ্ঠ হল ও ক্রমে যৌবনপ্রাপ্তির মধ্য দিয়ে এক নবীন বিজ্ঞানরূপে নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠা করে নিল – তারই এক অনুপুঙ্খ বিবরণ ও বিশ্লেষণ আছে এই গ্রন্থে। আজ যখন বিশ্বজুড়ে মেশিন লার্নিং, নিউরাল নেটওয়ার্ক, ডেটা সায়েন্স, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স প্রভৃতি অত্যাধুনিক বিজ্ঞানের শাখাগুলির সঙ্গে, আদান প্রদানের মধ্য দিয়ে, রাশিবিজ্ঞান নবকলেবর ধারণ করছে, সেই সন্ধিক্ষণে, রাশিবিজ্ঞানীর আত্মপরিচয়, আত্মসমীক্ষা ও আত্মবিশ্বাস প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে এই গ্রন্থের পুনর্পাঠ ও পুনর্মুদ্রণ প্রয়োজন।
          কথা শেষ করব, প্রাচ্যের এক মহর্ষির উদ্ধৃতি দিয়ে। প্রাচীন চিনের পরিব্রাজক-দার্শনিক লাওৎ-সে, যথার্থ প্রাজ্ঞ ব্যক্তি সম্পর্কে যা বলেছিলেন – ইংরাজি ভাষান্তরে তা এই রকম:

‘Because he does not display himself,
People can see his light.
Because he has nothing to prove,
People can trust his words.
Because he has no goal in mind,
Everything he does, succeeds.’

(২৬ জুন ২০২৪ সালে, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাশিবিজ্ঞান বিভাগে প্রদত্ত ভাষণের ভিত্তিতে লিখিত)

মাস্টারমশাই
কৌস্তুভ বন্দ্যোপাধ্যায়

পুত্রাৎ শিষ্যাৎ পরাজয়ে গৌরবের হানি হয় না নাকি। বাবার মনে কিন্তু বিলক্ষণ দাগা লেগেছিল, যখন অঙ্কের খাতাটা কোলের ওপর ছুঁড়ে বলেছিলাম – দেখো, দেখো, তুমি যা বললে তাই করলে অঙ্ক মিলছে না। খাতাটা নিয়ে চুপ করে বসে রইল, মুখটা ঘোরাল অন্য দিকে। খারাপ লাগল। কিন্তু, তীর যে লক্ষ্যে পৌঁছে গেছে!
          শ্রীপ্রকৃতিকুমার শূর পড়ার টেবিলে আবির্ভূত হলেন, এর কিছুদিন পরে। ক্লাস ফাইভের হাফ ইয়ার্লি হয়ে গেছে। কানে লেগে থাকার মতো একটি বিচিত্র গলা খাঁকারি শুনে চমকে উঠে টেবিলের ওপর মাথা উঁচিয়ে দেখলাম, প্রায় কৃষ্ণবর্ণের কাঁচওয়ালা অদ্ভুত চশমাধারী গম্ভীর একটি মানুষ আপিসের এই এত মোটা একটা ব্যাগ টেবিলের ওপর ধপ করে রাখলেন, এক ঝলক চাইলেন, ব্যাগ হাতড়ে বের করলেন এক প্যাকেট চার্মস, দেশলাই বাক্স। পরম যত্নে, সিগারেট প্যাকেটের ওপর দেশলাই রাখা হল। ব্যাগ টেবিল থেকে মেঝেতে গেল, পিছুপিছু চায়ের কাপ হাতে মা এল, চায়ে চুমুক দিয়ে কেশব নাগের কতগুলো মার্কামারা অঙ্ক কষতে দিয়ে মাস্টারমশাই টেবিলে তবলার বোল তুলতে লাগলেন।
          মিহি করে বললাম, হয়ে গেছে মাস্টারমশাই। আবার এক ঝলক চাউনি, খাতাটি নিয়ে এই বার শুরু হল রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ। পাঁচ মিনিট পর দেখা গেল সাদা কাগজের ওপর পেনসিলে লেখা হরফগুলো লাল কালির কারেকশনে ভর্তি। কাটাকুটি শুধু অঙ্কে হয়নি, লক্ষ্যণীয়ভাবে হয়েছে অঙ্ক সমাধানের ভাষাতেও। সেগুলো কেন দরকারি, সেইটে ছাত্রকে বুঝিয়ে পরিশেষে একটি মর্মভেদী বাক্য : বাংলা তো আমাদের মাতৃভাষা, নয় কি? উপরি পাওনা, একটি ফিচেল হাসি। বোঝা গেল, ইনি হাসতেও জানেন।
          সেই শুরু। আকাশের দেবতা যত প্রকার সংগ্রহযোগ্য অঙ্কের বই সৃষ্টি করে কলেজ পাড়ার পুরনো বইয়ের দোকানের জঠরে গচ্ছিত রেখেছেন, সেই সমস্ত অঙ্কের বই যোগাড় করা শুরু; প্রতিটি বই কেন কীহেতু অন্য বইয়ের চেয়ে বিশিষ্ট তার ব্যাখ্যা, টীকাসমেত ছাত্রের হৃদয়ে গেঁথে দেওয়ার শুরু; অঙ্কের সমাধানপর্ব শুরু; যে অঙ্ক আটকে যাবে সেই অঙ্কের সামনে সশরীরে খাড়া হয়ে আক্ষরিক অর্থে সেলাম বাজানোর শুরু; আর সবার উপরে যথোপযুক্ত সময়ে মান্না দে-র সেই অমর গানগুলির পুনরাবৃত্তির শুরু :‘হৃদয়ের গান শিখে তো গায় গো সবাই/কজন আর হৃদয় দিয়ে গাইতে জানে’ কিংবা, ‘হৃদয়ে লেখো নাম, সে নাম রয়ে যাবে’।আজও এই গান আমার কাছে তপস্যামগ্ন কোনও বিরহী যক্ষ নয়, শ্রীপ্রকৃতিকুমার শূরের ছবি জাগিয়ে তোলে।
          যে শুধুই ক্রিকেট জানে, সে ক্রিকেটের জানেটা কী? বলেছিলেন এক বিখ্যাত ক্রিকেটরসিক। একই যুক্তিক্রমে, যে অঙ্ক জানে, সে কি ব্যাকরণ জানবে না? শব্দছক করবে না? ভ্রমণলিপ্সু হবে না? যে শুধুই অঙ্ক জানে সে কি হৃষীকেশ মুখোপাধ্যায়ের আনন্দ চলচ্চিত্রের রসগ্রহণে ব্যর্থ হবে? মোচার ঘণ্ট কী কী অনুপানযোগে খাদ্যরসিকের মন মজাতে সমর্থ হবে, তা নিয়ে সে নিস্পৃহ থাকতে পারে আদৌ, স্রেফ অঙ্ক জানে বলে? এমন উৎকট গুমোর আর যারই থাক, শ্রীপ্রকৃতিকুমার শূরের নেই।
          ক্লাস ফাইভের হাফ ইয়ার্লির পর সেই যে তিনি এলেন তাঁর খোকার কাছে, ক্রমে মাস্টারমশাইয়ের স্বভাবসিদ্ধ গণ্ডি টপকে হয়ে উঠলেন গোটা পরিবারের পরম শুভানুধ্যায়ী। বাবার দুটো হার্ট অ্যাটাক, মা হাসপাতাল ডাক্তার নিয়ে ব্যতিব্যস্ত, শ্রীপ্রকৃতিকুমার শূর নিঃশব্দে ঘড়ির কাঁটা ধরে ন্যস্ত দায়িত্ব শুধু পালন করেননি, সম্পূর্ণ অযাচিত ভাবেই নতুন নতুন দায়িত্ব ঘাড়ে তুলে নিয়ে খোকাকে তরিয়ে দেওয়ার ভার নিয়েছেন। এরই কাছাকাছি সময়ে দেখেছি ‘সাত পাকে বাঁধা’র সেই চোয়াল-শক্ত মাইনে-করা মাস্টারকে, শাশুড়ি ঠাকরুন যাকে গুণ্ডা বলে নির্ভুল শনাক্ত করেছিলেন। নাঃ, মাইনে দিয়ে এতটা পাওয়া যায় না ছায়া দেবী!
          পারিবারিক বিপর্যয়েই শুধু নয়, আরোগ্যের সময়েও মাস্টারমশাই আমাদের হাত ধরেছেন। তাঁরই উদ্যোগে প্রথম সমুদ্র দর্শন, দক্ষিণ ভারত ভ্রমণ, ঝাড়গ্রাম রাজবাড়িতে থাকা, হিমাচল প্রদেশ দেখা। তাঁর সূত্রেই পরিচয় স্বর্ণ মন্দিরে সেই শিখ ভদ্রলোকটির সঙ্গে, ১৯৮৪ সালের তেইশ বছর পরেও বাবাকে দেখে যিনি বলে উঠবেন, ‘আপ জ্যোতি বাসুজিকা বঙ্গাল সে আয়ে হ্যাঁয় না?’ আর বাবা, আমার দিকে চেয়ে একটু মুচকি হাসবে। কেউ কেউ সহজেই ভোলে। ঠিক।
          দক্ষিণ ভারতেরই কোনও একটি স্টেশনে, রাত্তির বেলা বসে আছি। রেল পুলিশের চোখ এড়িয়ে যতদূর সম্ভব ধূমপান করা গেছে, বাবার সম্মতিক্রমে। কলেজে পড়ি বলে কথা। হাতে কোনও কাজ নেই, বইপত্র পড়া শেষ। ট্রেনের দেখা নেই। সেই প্রায় জনমানবশূন্য স্টেশনে, খাতা কলম দিয়ে মাস্টারমশাইকে বললাম, কিছু শক্ত শক্ত ফ্যাক্টরের অঙ্ক দিন না। বলার অপেক্ষা। কলম বেয়ে হুড়মুড় করে নেমে এল খান দশেক বাছাই করা চিজ। কাজে লেগে গেলাম। অপাঙ্গে দেখলাম, এই বিচিত্র প্রস্তাবে, আমার সেই আহত ও অবসৃত বাবার মুখে এক স্বর্গীয় হাসি ফুটে উঠেছে, এত দিনে।
          শ্রীপ্রকৃতিকুমার শূরের নির্দেশে সংগৃহীত অঙ্কের বই এখন খোকাকে দিই। সংশোধনের সময় সমাধানের ভাষা শোধরাতে ত্রুটি করি না। কালকেই দুটো সমীকরণের ডান দিকে এক আর দুই লিখে গোল্লা পাকিয়ে বলছিলাম – এক ও দুই একত্রে বিবেচনা করে পাই …। ওই সেই শব্দ – বিবেচনা – শ্রীপ্রকৃতিকুমার শূরের দান। যা কলমে আসে, কাজের বেলায় মনে পড়ে না সর্বদা।
          একটু বিবেচনা। অপরের কথা শোনার সময়, চুপ করে যাওয়াই যেখানে সংগত সেখানে মুখর হয়ে ওঠার আগে, অথবা
নিদান হাঁকার সময় – এই বিবেচনাই বাঁচিয়ে দিতে পারে এখনও। ছায়া দেবীদের উপস্থিতি সত্ত্বেও।
          ট্রেন আসতে এখনও কিছু দেরি। খাতায়, উৎপাদকে বিশ্লেষণ। সামনে, শ্রীপ্রকৃতিকুমার শূর।

শিল্পী: উইলিয়াম হিথ রবিনসন

ভালো
গৌরাঙ্গদেব চট্টোপাধ্যায়
শিক্ষক, রাশিবিজ্ঞান বিভাগ, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়

কেমন করে হব মাগো ভালো?
সেই কথাটা বুঝিয়ে আমায় বলো।
ক্লাসের মধ্যে ষোলো আমার স্থান,
সেই জন্য কি তোমার অভিমান?
বিজ্ঞান আর অঙ্কে আমি কাঁচা,
পরীক্ষাতে যাহোক করে বাঁচা।
চেষ্টা করি, পেরে উঠিনা মোটে,
মাথায় ঠিকটা কিছুতেই না জোটে।
বাংলা ভাষা বড্ড ভালোবাসি,
পড়ি যখন আসে তৃপ্তির হাসি।
লিখতে পারি পাতার পর পাতা,
আছে গো আমার গোপন একটা খাতা।
কিন্তু শুনি ওসব করা বৃথা,
জয়েন্ট জুটলে নিচু হবে না মাথা।
সেখানেও নাকি উপর নীচ আছে,
নীচের গ্লানি মুক্ত মানির কাছে।
যাই হোক আমি যাচ্ছি তেড়ে লড়ে,
বাবা মায়ের ভালোবাসার বোড়ে।
লুকিয়ে পড়ি বাংলা কবিতা, গল্প
মন মানে না, মনে হয় তা অল্প।
অঙ্কে দেখি আমি হঠাৎ করে,
পঞ্চাশেতে দিনু আটচল্লিশ মেরে।
উদ্ভাসিত বাবা মায়ের মুখ,
পড়ছে ধরা, ধরার সব সুখ।
যেই শুনেছে পাশের বাড়ির নাটা,
একটিমাত্র নম্বর গেছে কাটা –
অমনি দেখি বাবা-মার মুখ ভার,
সব কিছু যেন হয়ে গেছে ছারখার।
বুঝলুম তাতে, আমার ভালো হওয়া,
আমার গুণে বৃথাই খুঁজতে যাওয়া।
অন্যে হলে আমার থেকে কম,
তখন সবাই বুঝবে আমার দম।
বলো দেখি অন্যকে জানি কিসে,
অন্যের মন আমাতে তো নেই মিশে।
অন্যেরা কি ডানা মেলতে পারে?
আমার ডানা কবেই পরপারে।
জানো, আমি ছড়া লিখতে পারি,
ভালো করে যদিও বলতে নারি।
বাবার চাহিদা, আমি যেন গাই গান,
শুধু ছড়া লিখে পাবো কি সম্মান?
আমার কোনো ভালোলাগাই নেই,
সঁপেছি সব মা-বাবার চরণেই।
যদিও জানি তাদের অনেক সাধ,
না মিটলেই গুণবে পরমাদ।
তবুও জানি এ ভালোবাসাই খাঁটি,
তাই তো আমি এমনিভাবে খাটি।
ওদের ভালোতে ঠাঁই পাই বা না পাই,
আমি শুধু ভালো মানুষ হতেই চাই।