যশোর রোডে সেপ্টেম্বর। অ্যালেন গিনসবার্গ
তরজমা : কৌস্তুভ বন্দ্যোপাধ্যায়

ফটো: পিটার অরলোভস্কি
লক্ষ লক্ষ শিশু, খালি আকাশের দিকে চায়
কেন স্ফীতোদর হল তারা, চোখ ছিটকে বেরোবে প্রায়
যশোর রোডের ওপর — বাঁশবাগানের মতো বাসা
নর্দমাটা কি আমার? খালি সেইটুকু প্রত্যাশা
লক্ষ লক্ষ বাপের চোখের জল আজ থামবে না
লক্ষ লক্ষ মায়ের নাড়ির টান কেউ কাটবে না
ভাইটা কোথায় গেল? কেন মুখটা যাচ্ছি ভুলে
বোনের পরমাগতি তবে রূপনারানের কূলে?
কাকিমা পেট ভরে ভাত খাবে
কাকুর শ্মশানে রাত্রিবাস
দাদুর ঘর হারানোর শান্তি
দিদিমা চুপিচুপি খেল ঘাস
মেয়েরা কাদা ঘাঁটতেই থাকে
ছেলেরা বন্যার জলে স্নান
বমি করে মেয়েগুলো
বাপমায়েরা এখনো ম্লান!
লক্ষ আত্মা শরীর ধরেছে একাত্তরের দিনে
রিফিউজিরাই রাজা। বসেছে যশোর রোডের ঋণে
সূর্য এখন ধূসর। লক্ষ মানুষের বলিদান
এবার মোকাম কলিকাতা। ওরা পূর্ব পাকিস্তান
সেপ্টেম্বরে যশোর রোডের ওপরে ট্যাক্সিগাড়ি
মোষকে দেখছি কয়লা টানতে নতুন রাজার বাড়ি
নতুন বন্যা চুঁইয়ে সতেজ করছে পুরোনো জমি
ঘুঁটেভরা গাছপালা, আর প্লাস্টিকে ছাওয়া ভূমি
ভিজতে ভিজতে হাঁটা, মা-বাপ দৃষ্টির জলে ভেজে
মগ্নমিছিল মৌনদৃষ্টি এখনও কাউকে খোঁজে!
হাড়হাভাতের দলের দেখেছি চোখগুলো বড় বড়
চামড়ার রং কালো। ওরা খ্রিস্টের চেয়ে দড়
দুমড়ে বসে, মায়েরা কাঁদে, পেটের ছেলেটি কেন
বুড়ি সন্নিসি অবুঝ মতো সে, পা-টি রুগ্ন যেন
কচি কচি ওই জোড়হাতে মাখা আমার চোখের জল?
পাঁচ মাস বেঁচে ছিলি? আজ মরবি কিনা বল।
একটা মাদুর, শূন্য কলস – এখানে আমাকে পাবে
হাতটি উঁচিয়ে বাবা চিরদিন জানান দিয়েই যাবে
ওই আমাদের সংরাগ আর মায়ের অভিজ্ঞান
মায়াকে পাবে না। দেখে যাও এই গহন স্বপনস্নান
তালপাতা ছাওয়া মাটির দাওয়ায় দুটি বাচ্চার চোখ
আমাকে বিঁধছে নীরব চাউনি: সাদা চামড়ার লোক!
রেশনের চাল, মুঠিভরা ডাল সপ্তাহে একবার
সৈন্যসেবিত গুঁড়ো দুধটাও শিশুদের দরকার!
শাকপাতা নেই, টাকাপয়সাও, অথবা একটা কাজ
ভাত খাওয়া চলে চারদিন আরও খিদে পেলে পড়ে বাজ
টানা তিনদিন দানাও পড়েনি ছোট ছোট দুটি মুখে
বমিতে ভাসবে পরের ভাতটা, না খেলে ধৈর্যবুকে
যশোর রোডের মা কেঁদেছেন আমার পায়ের পর
বাঙালি জবানে মিস্টার ওগো একটুকু দয়া কর
খোকার বাপ যে হত্যে দিয়েছে ক্যাম্প অফিসের দোর
ছেঁড়া কার্ড এই মেঝেতে ছড়ানো, পরিচয়হীন ক্রোড়
খোকা খেলা করে আপনমনে, বন্যা বাঁধেন মা
খেলার ছলে কুটিকুটি করা পরিচয় ফেরে না
কাগজ ছাড়া তো রেশন অমিল, কী খাবে মা, বাপ?
আমার পার্সে ছেঁড়াখোড়া সেই নিষ্পাপ অভিশাপ
পুলিশ দুটোকে বন্দি করেছে বাচ্চা হাজার খানেক
পাউরুটি পেতে গলা মিলিয়েছে দৈনন্দিন গানে
হুইসল মুখে বাঁশলাঠি ঠুকে সমঝে চলতে বলা
বাচ্চাগুলোকে জলদি শেখায় ক্ষুধার্তদের কলা
লাফ মেরে তুই লাইন ভাঙলি, সামনে আসবি বলে?
রুগ্ন শুয়ার বাচ্চা আমাকে মূর্খ ভাবলে চলে!
কাদাজল মাখা নাট্যমঞ্চে নেচে যায় দুটি ভাই
হুইসল ফুঁকে পুলিশ দুটিও শিবের গাজন গাই
ছানাপোনাগুলো জটলা বাধায় ঠিক এখানেই কেন
হাসছে খেলছে গুঁতোগুতি করে, দাবিও তুলছে যেন
হাসিখুশি মুখে ভয় মুঠি করে কীসের অপেক্ষা?
কেন এই বাড়ি বাঁধা হয়ে থাকে রুটি বিলোনোর গান?
দরজা খুলে লোকটা বেরিয়ে চিৎকার করে বলে
ছেলেমেয়েদের হাজার কন্ঠ সোচ্চারে দলে দলে
আনন্দ? নাকি প্রার্থনা? ‘আর মিলবে না আজ রুটি’
অট্টহাস্যে হাজার ফুর্তি যেন বলে গেল, ‘ছুটি!’
দুদ্দাড় করে ছুটেছে তাঁবুতে, বুড়োগুলো বসে আছে
রাষ্ট্রের রুটি দেবশিশুরাই এনেছে মুখের কাছে
রুটি ফুরিয়েছে! তবে আজ বিধি ফেরালেন মুখ!
ম্লানমুখে দেবশিশুরা টানছে কাঁচা খিস্তির সুখ।
অনাহার টানা চলতেই থাকে দীর্ঘ দীর্ঘ মাস
হাজার হাজার কঙ্কাল আর দহনযোগ্য শাঁস
পেট ছেড়ে গেছে, শূন্য উদর, সময় লাগে না তাতে
ভাতের মতোই মেলেনি ওষুধ, নার্সও রিক্ত হাতে
রিফিউজিদল আস্তানা গাড়ে আরোগ্য নিকেতন
চোখ ফুটতেই ল্যাংটো শিশুরা খুঁজেছে মায়ের স্তন
পোলিওক্লিষ্ট ক্ষুদ্র শরীর ভরসা শীর্ণ কোলে
হাজার হাজার বিষধর সাপ বাঁশির সুরেই দোলে
সেপ্টেম্বরে রিকশা ছুটছে যশোর রোডের পরে
অর্ধ লক্ষ নগ্ন আত্মা একটি ক্যাম্পে ধরে
বাঁশের খুঁটি মাটির দাওয়া বন্যার জলে ভাসে
খোলা নর্দমা, সিক্ত মানুষ ভাতের তাড়সে কাশে
বন্যার জলে ট্রাক আটকেছে, খাবার বন্দি করা
ওগো আমেরিকা মেশিনদেবতা খাদ্য পাঠাও ত্বরা
আজই হারালে পররাষ্ট্রীয় নীতিগত অঙ্গুলি?
নাকি তোমাদের মেশিনগানেরা শিশুদের করে গুলি?
গেল কোথা সব হেলিকপ্টার, যুক্তরাষ্ট্র এইডের
নেশার দ্রব্য চালানে ব্যস্ত, ব্যাঙ্কক গ্রিন শেডে।
ওগো আমেরিকা বায়বীয় পোত, আলো দেখাবে না তুমি?
নর্থ লাওসে কি দিনমান বোমা ফাটিয়েই যাবে তুমি?
রাষ্ট্রপতির সেনা আমাদের, শুনেছি তারা যা সোনা!
ক্ষমাসুন্দর সাহসী হৃদয় কোটি কোটি যাবে গোনা
তারা আনবে না ওষুধপত্র, খাদ্য, বস্ত্র, ত্রাণ?
নাপাম ফেলেই ভিয়েতনামের বাড়িয়ে চলবে মান?
আমাদের চোখ শুকনো কী করে? যন্ত্রণা পেয়ে কাঁদে?
অরোধ্য এই বৃষ্টিতে নীড় কী করে মানুষ বাঁধে?
যশোর রোডের শিশুরা তাদের বড় বড় চোখ বোজে
আমার বাবাটা মরে গেলে কাল কোথায় ঘুমোব খোঁজে
ভাত কাপড়ের জন্যে আমায় কার কাছে যেতে হবে?
ময়লায় ঘোলা বন্যার জলে শুধু রুটি পেলে হবে?
লক্ষ লক্ষ শিশুরা উতল বর্ষামুখর দিনে
লক্ষ লক্ষ শিশু কেঁদে যায় যশোর রোডের ঋণে
তোমাদের মুখ এখনও বন্ধ, প্রথম বিশ্ববাসী!
এত যন্ত্রণা দেখে কাঁপছ না, প্রেম গেল বুঝি ব্যাসকাশী
তড়িৎযন্ত্রে তৎপর হোক মেশিনের তর্জনী
আমেরিকান মগজে দেবে না ক্ষণিক চেতনা বুনি?
কোথায় হারাল শৈশব, আজ কোথায় এলাম আমি?
এই মেয়েরা কাদের বাড়ির, অশালীন প্রেতগামী?
আত্মার প্রতি লক্ষ রাখিনি, আমার হয়নি যে ঘর ধোওয়া
বন্ধু, সাহসে যে গান ভুলেছ, আজ তাই দিয়ে হাত ছোঁওয়া
কাদায় মাখছে কান্না, পাশেই ছেঁড়াখোড়া এক বাড়ি
পাইপলাইনে রাত্রিযাপন, বৃষ্টিতে ছেঁড়া নাড়ি
কলের জলের জন্য লাইন! এও দেখা ছিল বাকি!
কুঁকড়িয়ে মরে অভুক্ত শিশু, মা জল পায়নি নাকি!
আমি কি এমন কুঁকড়ে মরেছি কোনও বিস্মৃতিলোকে?
আমি কী করব? জিজ্ঞাসা কবি সুনীল গাঙ্গুলিকে
এগিয়ে চলব? দু-চার আনাও পয়সা দেব না আমি?
মাংসমুগ্ধ শরীর আমার কোথা অন্তর্যামী?
এ শহরে কী আসে যায় বলো, গাড়ি বাড়ি করে কারা?
মঙ্গল গ্রহে পদচ্ছাপের মূল্য যায়নি হারা?
লক্ষ মানুষ রাস্তায় বসা পাঁচতারা নিউ ইয়র্ক
ডিনার টেবলে কী পরিবেষণ? ঢিমে রোস্টেড পর্ক
কত সে লক্ষ বিয়রের ক্যান ত্যক্ত পারাবার
মায়েরা মূল্য ঠিকই জানেন, মাতাল সিগার
ভাদরের গ্যাসোলিন আর অ্যাসফল্ট গাড়ি স্বপ্ন
পূতিগন্ধের পৃথিবী আর সাতটি তারার যত্ন
যুদ্ধ থামাও। দীর্ঘশ্বাস ফেলো
এখনো কতটা নুন রয়ে গেছে তোমার অশ্রুজলে
লক্ষ লক্ষ প্রেতের জন্ম তোমাদের আগ্রহে
টিভি খুললেই অভুক্ত খুঁজে পাবেই তোমার ঘরে
কত সে লক্ষ শিশু মরে গেলে তবে,
মা জননীরা দিব্যদৃষ্টি লভেন?
সুনাগরিকের কত কর চোষা বাকি,
গর্বোদ্ধত শিশুহন্তারা কি সেনাপোশাকেও বাপের নজর পাবেন?
আর কত লাখ আত্মারা পাড়ি দেবে
আর কত লাখ শিশুরা তাড়সে কাঁদে
আর কত পরিবারের চক্ষুহারা
আর কতজন দিদিমা প্রেতিনী হবেন?
আর কতজন প্রেয়সী পাবে না রুটি?
আর কতজন কাকিমা জুড়োবে জ্বালা?
আর কত বোন মাথা খুঁড়ে শুয়ে পড়ে?
আর কতজন দাদুও নির্বাপিত?
আর কত বাপ ধুঁকতে ধুঁকতে যাবে?
আর কত ছেলে পথেই হারাল পথ?
আর কত মেয়ে আজও খেল না কিছু?
শীর্ণক্লিষ্ট পা দুটি টেনে টেনে, এ মরুপথ পেরোনো যাবে?
লক্ষ লক্ষ শিশুরা কেবল কাঁদে
লক্ষ লক্ষ মায়েরা অঝোর ধারায়
লক্ষ লক্ষ ভায়েরা পাগলপারা
লক্ষ লক্ষ সন্তান চাঁপা তরু
(মূল কবিতার হুবহু বঙ্গানুবাদ এটি একেবারেই নয়, মূল রচনা অনুসরণের অক্ষম চেষ্টা। পাঠক যেন মূল কবিতার কাছেই ফিরে যান, এটাই আমাদের অনুরোধ)