
ফটো: ক্লিম মুসালিমভ
দ্রৌপদী
প্রতিভা সরকার
পরিবর্তন টের পাচ্ছিল গোপালি। হাত পা কেমন যেন ভরাট। বুকে বাদামী রঙের নরম দুটো চোখ একটু উঁচু হয়ে উঠল। চোখ নয়, কিন্তু দেখতে একেবারে চোখের মতো।
সরকারি স্কুল ড্রেস ছাড়া তার একটা মাত্র জামা। আর ছেঁড়া একটা রোদে শুকোচ্ছে। ভালো জামাটা সবেধন নীলমণি। সামনে চড়কের মেলা আসছে।
তবে সদ্য এগারোর শারীরিক পরিবর্তন মা-ও লক্ষ্য করেছে। আজ পাথর ভাঙা মজুরি পেলে মেয়েটার জন্য হাট থেকে একটা টেপজামা কিনবেই। তাই বেরোবার আগে বলল, আমি ফিরে আসি, তারপর খেলতে যাস।
কাঁথায় গড়াগড়ি দিতে দিতে গোপালি শুনল বাচ্চাদের চিৎকার, কুমির, তোর জলকে নেমেছি! কুমির-ডাঙা খেলা! লাফ দিয়ে ওঠে ইজের-সম্বল গোপালি। তারপর উদ্দাম লাফালাফি। খেলুড়েদের পাশ দিয়ে কেউ গেলেই খেলা থামিয়ে বিবেকানন্দ পোজে দাঁড়িয়ে পড়ে।
সবাই বেখেয়াল, কিন্তু পশুদা নয়। খেলা শেষে ঠিক পথ আটকাল। ধমকে বলল, হাতদুটো নামা। কাঁধে ধরে খুঁটিয়ে দেখে তারপর পিচিক করে থুথু ফেলে, এঃ, তোরও বক্ষ উঠে গেল!
মহাভারতে শুনেছে গোপালি : ‘বসন টানিয়া ধরে পাপী দুঃশাসন/না আছে চোখের লজ্জা, না শুনে বারণ।/ রহো রহো বলি কান্দে কুন্তী-পুত্রবধূ,/ দুই হস্ত দিয়া ঢাকে বক্ষফুলমধু।।’
শরীর নিয়ে লজ্জায় কেন্নোর মত গুটিয়ে গেল সে। কিন্তু পশুদা বোঝে! হাত ধরে টেনে নিয়ে গেল বাঁশঝাড়ে।
উঃ পশুদা!
পশুর হাতের টানে কিছু ছিল, বুনোভাব, নিষ্ঠুরতা, একটা তাড়াহুড়ো, গোপালি কেদেঁ ফেলল।
– দাঁড়া, দাঁড়া এইখানে। দেখতে দে আর কী কী উঠল!
পশুর দাঁতের সারি খুশিতে ঝিকিয়ে ওঠে।
শরীর মোচড়ায় গোপালি, ছাড়ো, ছাড়ো।
– আরে, কিছুতো করছি না, শুধু একটু দেখব, দেখতেও দিবি না! আশ্চর্য মেয়ে তো!
খোলা গায়ে হাত ঘুরে বেড়ায়, বুকের ওপর শিরশির করে মধ্যমার পেছনে গোল হয়ে থাকা রূপোর আংটির শীতলতা। মা ফেরেনি। বন্ধুরা চলে গেছে। কাকে ডাকবে গোপালি?
হঠাৎ গোপালি বলে,
কেলে, তুই! দ্যাখ পশুদার কান্ড!
চমকে পেছন ফেরে পশু, কই কেলে? কেলে কোথায়?
মোক্ষম সুযোগ। গোপালির দাঁত বসে যায় গোবদা হাতে।
হরিণের মতো ছুটতে ছুটতে গোপালি ভাবে, দ্রৌপদীটা কী বোকা! ওর কি দাঁত ছিল না? না রানিমা বলে কামড়াতে জানত না!