প্রবন্ধ

পবিত্র মিত্র (সুশান্তকুমার চট্টোপাধ্যায়ের সৌজন্যে)

পবিত্র মিত্র : এক আধুনিক প্রেমের গীতিকার
স্বপ্নসোপান দত্ত

‘কবিতার কথা পড়ার জন্য আর গানের কথা শোনার জন্য’, একথা আমার না, বাংলা ‘আধুনিক’ গানের পুরুষোত্তম রবীন্দ্রনাথের। তাই ভীষণ আধুনিক, ‘স্মার্ট’ শব্দচয়ন করলেই তা গান হয়ে ওঠে না, হয়ে ওঠে তখনই যখন কথা মূলত সুরের বাহন। এই সারসত্য বুঝতেন যাঁরা তাঁদের মধ্যে অন্যতম এক নাম পবিত্র মিত্র (১৯১৮-১৯৭৫), আমাদের স্বর্ণযুগের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। তবে আরও অনেকের মতো এই গীতিকারও বাঙালির অসামান্য বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে গেছেন। তিনি যে ঢাকার মানুষ, গায়ক-সুরকার-শিক্ষক সুধীরলাল চক্রবর্তীর পরম বন্ধু, প্রথমে বেতারকেন্দ্র এবং পরে গ্রামোফোন কোম্পানির কর্তা, এইটুকু ছাড়া অনেক খুঁজেও আর বিশেষ কিছু জানা যায় না। শুধু তাঁর মৃত্যুহীন গানগুলি রয়ে গেছে।
          একটি গান, তার আবহসঙ্গীতসহ, আমার বড় প্রিয়। যতবার শুনি মনে হয় এটি একটি সার্থক আধুনিক গান। এই ‘আকাশপ্রদীপ জ্বলে’ গানের (১) সুরকার প্রখ্যাত গায়ক সতীনাথ মুখোপাধ্যায়। বহুশ্রুত রূপটির বাইরে উৎপলা সেনের সঙ্গে সতীনাথের দূরদর্শনে গাওয়া গানটি এখন ইউটিউবে পাওয়া যায়, সবাইকে একবার শুনে দেখতে অনুরোধ করি। সঞ্চারীর কথাগুলি লক্ষ্যণীয়, ‘কত কাল আর কত কাল, এই পথচলা ওগো চলবে/ কত রাত এই হিয়া আকাশপ্রদীপ হয়ে জ্বলবে।’ এরপরে আসে, ‘কোনও রাতে মনে কী গো পড়বে, ব্যথা হয়ে আঁখিজল ঝরবে’। এটাই পবিত্রর বৈশিষ্ট্য, প্রেমের গান মানে একপক্ষ তার সবটা উজাড় করে দিয়ে পথ চেয়ে বসে আছে তা নয়, অপরপক্ষেরও একই রকম দায় আছে সেই অনুভূতিকে মর্যাদা দেওয়ার, সমানুপাতে ফেরত দেওয়ার। এখানেই পবিত্র মিত্র আশ্চর্য আধুনিক।
          এরকমই আরেকটি গান (২) উৎপলা সেনের গাওয়া ‘ঘুম ঘুম এই রাত সুন্দর’। এখানে আছে, ‘বাতাসে দুলে দুলে ফুলেরা জেগেছে ওই/ সে খুশির ছোঁয়া বুঝি এ মনে লেগেছে ওই’। এ যেন অনেকটা ‘আমার চেতনার রঙে পান্না হলো সবুজ’ যেখানে বাতাস আর ফুলের কানাকানির সঙ্গে মনের ভাব একাত্ম হয়ে যায়। আবার সঞ্চারীতে, ‘কত যে পথ চেয়ে গিয়েছে বয়ে বেলা/ এল যে মায়ারাতে মন দেয়ানেয়া খেলা’, আর রূপকে নয়, সরাসরি বলা হয়েছে মায়ারাতে ‘দেয়ানেয়া’ খেলার কারণেই প্রেম সার্থকতা পায়। ‘আমি রূপে তোমায় ভোলাব না, ভালোবাসায় ভোলাব’ এবং তুমি আমার জন্য কী করলে তার তোয়াক্কা না করে একতরফা করেই যাব, এই প্রেমের থেকে ষাটের দশকের প্রেমকে পবিত্র সচেতনভাবে আলাদা করে দিচ্ছেন, বুঝিয়ে দিচ্ছেন যৌথ দায়িত্বের কথা যা আজ যে কোনও সম্পর্কের প্রসঙ্গে বার বার বলা হয়ে থাকে।
          একটি নির্মেদ, বাহুল্যবর্জিত, যতটুকু না হলেই নয় ঠিক ততটুকুই লিখব এমন পণ করে লেখা গান (৩) ‘তোমারেই বেসেছি ভালো, প্রথম ঊষার লগনে’, গায়িকা অপূর্ব প্লেফুল-কন্ঠী ইলা বসু। এর শেষাংশে আছে ‘যারা কাছে আসে যারা ফিরে যায়/ অনেক আলো হৃদয়ে ছড়ায়’। নিঃসংকোচে পরিষ্কার বলা হচ্ছে জীবনে একাধিক সম্পর্ক এসেছে, ঘনিষ্ঠ মুহূর্তও এসেছে বারংবার, তবু মনে পড়ে ‘তুমি প্রথম আলো ছড়িয়েছিলে/ ওগো মোর জীবনে’, সেই ঊষার লগনের কথা মনে বাজতে থাকে। এই সাহস আর এই স্মার্টনেস বড় বিরল।
          আমার প্রিয়তম গায়ক শ্যামল মিত্রের গাওয়া ‘সেদিনের সোনাঝরা সন্ধ্যা’ গানটি (৪) মনে পড়ল। এখানেও দেখি ‘দুজনে শুধাই
যদি তোমারে কি দিয়েছি, আমারেও তুমি কিবা দিলে’, কোনও রকম ঘুরিয়ে নাক না ধরে যেন বলা হচ্ছে আসলে অনেক কিছু দেওয়া হয়নি। ‘কোনও এক শ্বেতপাথরের প্রাসাদে’র ‘গানের পাখি’র কাছে কারুর কোনও প্রত্যাশা নেই কিন্তু প্রত্যাশা পূর্ণ না হওয়ার অভিমান নিয়ে ‘সোনাঝরা সন্ধ্যা’ আমাদের মনে এক আলাদা জায়গা নেয়। রবীন্দ্রনাথ থেকে শুরু করে সলিল বা গৌরীপ্রসন্নের গানের কথা আমাদের বারে বারে দোলা দিলেও, সেখানে ‘মালা গেঁথে কবে থেকে নিয়ে বসে আছি’ জাতীয় এক-তরফা কথাও বারে বারে প্রকাশ পেয়েছে। পবিত্র মিত্রের কাছে প্রেম মানে মালা গেঁথে বসে থাকা নয়, মালাবদল অবধি গেলেই তা সম্পূর্ণ হয়।
          আগে যা লিখেছি, তার থেকে কিন্তু এই সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া খুব ভুল হবে যে অন্য গীতিকারেরা যথেষ্ট ‘আধুনিক’ ছিলেন না। সুধীন দাশগুপ্তের নিজেরই লেখা গান ‘এক ঝাঁক পাখিদের মতো কিছু রোদ্দুর’ ধরুন। এখানে সঞ্চারীতে আমরা পাই, ‘পায়ে পায়ে সন্ধ্যার ক্লান্তি নিয়ে যারা যায় ফিরে ঘরে শহরে নগরে, পায় কি মনে সূর্যের গতিবেগ অস্তরাগের ছোঁয়া অন্তরে’। এই লাইন অনবদ্য তা বলা বাহুল্য। মনে হতেই পারে জীবনানন্দের স্বল্প-চর্চিত কবিতার পঙ্‌ক্তি। তবে, কথাগুলোর ওজন অনেক। সহজে, মসৃণ পথে মনে প্রবেশ করার ক্ষেত্রে এটি বাধা হিসাবে কাজ করতে পারে। একই ভাবে ‘চাঁদের তরণী তুমি সুদূরে মিলাবে’-ও বেশ ভারি।
          এর পাশে যদি আলপনা বন্দ্যোপাধ্যায়ের গাওয়া একটি গান (৫) ‘বকুল গন্ধে যদি বাতাস অন্ধ হয়ে’-কে রাখা যায় তাহলে দেখা যাবে সঞ্চারীতে রয়েছে, ‘এক মুঠি ধরা এই বকুলে, অনেক সুরভি মিশে রয়েছে, অনেক না বলা কথা আমার এই মন ওগো তোমার মনের কাছে কয়েছে’। এখানেও ‘না বলা কথা’ পাচ্ছি যা বলা হয়ে গেলে হয়তো প্রেম আরেক ধাপ এগোতে পারত কিন্তু তা হল না। পাশাপাশি এমন সব শব্দের ব্যবহার পাচ্ছি যা সহজবোধ্য কিন্তু লিরিক্যাল। পবিত্র মিত্র দেখান, যে সহজ কথা মানেই খেলো কথা না। অর্থাৎ বকুলের সুগন্ধ আর সম্পর্কের সুরভি কলমের জোরে একই বিন্দুতে এসে মিশেছে। এই গানটিও সময়ের নিরিখে দেখলে দুর্দান্ত স্মার্ট এবং সরাসরি চোখের দিকে চেয়ে কথা বলে। গানের শেষ লাইন, ‘তোমার আমার দেখা নয়তো শুধুই মধুমাসে’। মানে, কেবলমাত্র মধুমাসে মিলন হবে আর বাকি সময়ে আড়ালে থাকব তা হলে চলবে না! এর থেকে সোজা ভাবে একথা বলা সম্ভব না। এই মনের কথাটি কেউ বাস্তব জীবনে রূপক ব্যবহার করে বলবেনই বা কেন? তা হলে গানে তা সেই ভাবে এলে ক্ষতি কী?

১। সুর – সতীনাথ মুখোপাধ্যায়

আকাশপ্রদীপ জ্বলে দূরের তারার পানে চেয়ে,
আমার নয়ন দুটি শুধুই তোমারে চাহে –
ব্যথার বাদলে যায় ছেয়ে।
বহি চলে আঁধি আর রাত্রি
আমি চলি দিশাহীন যাত্রী
দূর অজানার পথে আকুল আশার খেয়া বেয়ে ।।
কতকাল আর কতকাল এই পথচলা ওগো চলবে,
কত রাত এ হিয়ায় আকাশপ্রদীপ হয়ে জ্বলবে।
কোনও রাতে মনে কি গো পড়বে
ব্যথা হয়ে আঁখিজল ঝরবে –
বাতাস আকুল হবে তোমার নিশ্বাসটুকু পেয়ে।।

২। সুর – শ্যামল মিত্র

ঘুম ঘুম এই রাত সুন্দর
সুন্দর ওই চাঁদ এ রাতে
আরও ভালো লাগে ওগো এই যে তুমি
রয়েছ আমার সাথে সাথে
বাতাসে দুলে দুলে ফুলেরা জেগেছে ওই
সে খুশির ছোঁয়া বুঝি এ মনে লেগেছে ওই
তাই জাগলো এ মন আজ নামেনি ঘুম আঁখিপাতে
হয়নি বলা যে কথা নাই যদি বা বলি
তোমার আমার মনে সেই ওঠে উথলি

কত যে পথ চেয়ে গিয়েছে বয়ে বেলা
এল যে মায়ারাতে মন দেওয়া নেওয়া খেলা
আমি জেনেছি যা মনে মনে এসেছি তাই জানাতে

৩। সুর – শ্যামল মিত্র

তোমারেই বেসেছি ভালো প্রথম ঊষার লগনে,
তাই এত ভালো কেউ লাগেনি তো মনে।
প্রথম ফাগুন নতুন পাতায়
অনুরাগের শিহর লাগায় –
সে কাঁপন একবারই জেগেছিল
সেদিন আমার এই মন গহনে –
ওগো মোর জীবনে।।
কতজনে কতবার শোনায়েছে কত সুর,
তখনই পড়েছে মনে, তুমি ছিলে আরও সুমধুর।
যারা কাছে আসে যারা ফিরে যায়
অনেক আলো হৃদয়ে ছড়ায়,
তখনই কেবলই, কেন মনে পড়ে
তুমি প্রথম আলো ছড়িয়েছিলে
ওগো মোর ভুবনে।।

৪। সুর – শ্যামল মিত্র

সেদিনের সোনাঝরা সন্ধ্যা
আর এমনি মায়াবী রাত মিলে,
দুজনে শুধাই যদি তোমারে কী দিয়েছি,
আমারেই তুমি কী বা দিলে।
মনের সোনার রঙে রাঙায়ে
নিজেরে নিয়েছি আমি সাজায়ে
জানি না তো কী যে তুমি দিয়েছ
গোপনেই তুমি কী বা নিলে।।
অস্তগোধূলি যবে মায়ারাতে ফুল হয়ে ফোটে,
তেমনি করেই জানি হৃদয়পাত্র মোর
অনেক সুধায় ভরে ওঠে।
কাজল ব্যথার মেঘ সরায়ে
আলোয় ভুবন দিলে ভরায়ে –
একথা যেমন করে জেনেছি
তুমিও কি তাই জেনেছিলে।।

৫। সুর – নচিকেতা ঘোষ

বকুলগন্ধে যদি বাতাস অন্ধ হয়ে
তোমার আমার কাছে আসে
তুমিও জানবে কিছু, আমিও বুঝব কিছু আভাসে।।
যেকথাটি আজও বলা হল না হল না,
সেকথাটি তুমি যেন বোলো না বোলো না –
অনেক তারার মেলা বসবে যখন দূর আকাশে।।
এক মুঠি ঝরা এই বকুলে
অনেক সুরভি মিশে রয়েছে,
অনেক না বলা কথা আমার এ মন
ওগো তোমার মনের কাছে কয়েছে।
এই তিথি ভুলে তুমি যেয়ো না যেয়ো না,
পথে যেতে ফিরে তুমি চেয়ো না চেয়ো না –
তোমার আমার দেখা নয়তো শুধুই মধুমাসে।।

ফটো: তাপস দে

দেখা হয়েছে: বার

5 2 votes
Article Rating
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x