বাংলাটা ঠিক আসে না! ভবানীপ্রসাদ মজুমদার

ছেলে আমার খুব ‘সিরিয়াস’ কথায়-কথায় হাসে না
জানেন দাদা, আমার ছেলের, বাংলাটা ঠিক আসেনা।
ইংলিশে ও ‘রাইমস’ বলে
‘ডিবেট’ করে, পড়াও চলে
আমার ছেলে খুব ‘পজেটিভ’ অলীক স্বপ্নে ভাসে না
জানেন দাদা, আমার ছেলের, বাংলাটা ঠিক আসে না।

‘ইংলিশ’ ওর গুলে খাওয়া, ওটাই ‘ফাস্ট’ ল্যাঙ্গুয়েজ
হিন্দি সেকেন্ড, সত্যি বলছি, হিন্দিতে ওর দারুণ তেজ।
কী লাভ বলুন বাংলা পড়ে?
বিমান ছেড়ে ঠেলায় চড়ে?
বেঙ্গলি ‘থার্ড ল্যাঙ্গুয়েজ’ তাই, তেমন ভালোবাসে না
জানে দাদা, আমার ছেলের, বাংলাটা ঠিক আসে না।

বাংলা আবার ভাষা নাকি, নেই কোনও ‘চার্ম’ বেঙ্গলিতে
সহজ-সরল এই কথাটা লজ্জা কীসের মেনে নিতে?
ইংলিশ ভেরি ফ্যান্টাসটিক
হিন্দি সুইট সায়েন্টিফিক
বেঙ্গলি ইজ গ্ল্যামারলেস, ওর ‘প্লেস’ এদের পাশে না
জানেন দাদা, আমার ছেলের, বাংলাটা ঠিক আসে না।

বাংলা যেন কেমন-কেমন, খুউব দুর্বল প্যানপ্যানে
শুনলে বেশি গা জ্বলে যায়, একঘেয়ে আর ঘ্যানঘ্যানে।
কীসের গরব? কীসের আশা?
আর চলে না বাংলা ভাষা
কবে যেন হয় ‘বেঙ্গলি ডে’, ফেব্রুয়ারি মাসে না?
জানেন দাদা, আমার ছেলের, বাংলাটা ঠিক আসে না।

ইংলিশ বেশ বোমবাস্টিং শব্দে ঠাসা দারুণ ভাষা
বেঙ্গলি ইজ ডিসগাস্টিং, ডিসগাস্টিং সর্বনাশা।
এই ভাষাতে দিবানিশি
হয় শুধু ভাই ‘পি.এন.পি.সি’
এই ভাষা তাই হলেও দিশি, সবাই ভালোবাসে না
জানেন দাদা, আমার ছেলের, বাংলাটা ঠিক আসেনা।

বাংলা ভাষা নিয়েই নাকি এংলা-প্যাংলা সবাই মুগ্ধ
বাংলা যাদের মাতৃভাষা, বাংলা যাদের মাতৃদুগ্ধ
মায়ের দুধের বড়ই অভাব
কৌটোর দুধ খাওয়াই স্বভাব
ওই দুধে তেজ-তাকত হয় না, বাংলাও তাই হাসে না
জানেন দাদা, আমার ছেলের, বাংলাটা ঠিক আসেনা।

বিদেশে কি বাংলা চলে? কেউ বোঝে না বাংলা কথা
বাংলা নিয়ে বড়াই করার চেয়েও ভালো নীরবতা।
আজ ইংলিশ বিশ্বভাষা
বাংলা ফিনিশ, নিঃস্ব আশা
বাংলা নিয়ে আজকাল কেউ সুখের স্বর্গে ভাসে না
জানেন দাদা, আমার ছেলের, বাংলাটা ঠিক আসেনা।

শেক্সপীয়র, ওয়ার্ডসওয়ার্থ, শেলী বা কীটস বা বায়রন
ভাষা ওদের কী বলিষ্ঠ, শক্ত-সবল যেন আয়রন
কাজী নজরুল-রবীন্দ্রনাথ
ওদের কাছে তুচ্ছ নেহাত
মাইকেল হেরে বাংলায় ফেরে, আবেগে-উচ্ছ্বাসে না
জানেন দাদা, আমার ছেলের বাংলাটা ঠিক আসেনা।

দেয়ালা পত্রিকার দ্বিতীয় সংখ্যা কবি ভবানীপ্রসাদ মজুমদারের স্মৃতিতে উৎসর্গ করা হল।

আস্তাকুঁড়ে ফেলে রেখে গেলে কী হয় বলা শক্ত, কিন্তু আশাদিদিদের খপ্পরে পড়লে, জম্মের শোধ একখানা কাগজ পাওয়াই যায়। সার্টিফিকেট বা ছাড়পত্র। এরপর যদি রোজ দুবেলা খিদেও পায়, রেশন কার্ড। রোগ বাধালে অমুক কার্ড। ইস্কুলে যেতে চাইলে কার্ড, অতিষ্ঠ হয়ে যেতে না চাইলে আর এক দফা ছাড়পত্র। মাথার ওপর তেরপল টাঙাতে চাইলে, দাওয়ায় বেড়া দিতে চাইলে, সাতসকালে নদী বা রেললাইনের ধারে যেতে না চাইলে, জলের কল চাইলে, বাতি চাইলে, সরকার মশাইয়ের কাছে কাজ চাইলে খরচটা অবশ্য মোটা রকম। কেননা এগুলো হচ্ছে পরিষেবা। মাগনা তো হয় না। গোটা চারেক কাগজে সন্তুষ্ট না থেকে আরও খান চারেক কাগজের বিনিময়ে, এটুকু পরিষেবা সরকার মশাইকে দেওয়া সুনাগরিক মাত্রেরই কর্তব্য। সেই তাঁকেই আবার গদিচ্যুত করবার ইচ্ছাও মনে লালন করা কি ঠিক? ভোট দিয়ে সরকার বেছে নেওয়া কি ভালো?
          এই যে নতুন কল করেছেন সরকার মশাই, যাতে আমাদের বাতিল করে, টাটকা নতুন মানুষ বেছে নেওয়া যায়, এটাই বরং স্বস্তির কথা। আশার কথা। এই পথেই আমাদের ক্রমমুক্তি হবে। সমস্যা খালি একটাই। আবলুসের মতো কালো সিড়িঙ্গে জটাধারী, কে যেন একটা ঘুমের ভেতর ঘাই মেরে উঠে বলছে, ‘মা এত জল দিয়ে ঘিরে রেখেছে তোকে, তাও তোর আগুনের ভয়?’

পূর্ব পাকিস্তান থেকে আগত মানুষ। সন, ১৯৪৭-৪৮।

যশোর রোডে সেপ্টেম্বর। অ্যালেন গিনসবার্গ
তরজমা : কৌস্তুভ বন্দ্যোপাধ্যায়

লক্ষ লক্ষ শিশু, খালি আকাশের দিকে চায়
কেন স্ফীতোদর হল তারা, চোখ ছিটকে বেরোবে প্রায়
যশোর রোডের ওপর – বাঁশবাগানের মতো বাসা
নর্দমাটা কি আমার? খালি সেইটুকু প্রত্যাশা

লক্ষ লক্ষ বাপের চোখের জল আজ থামবে না
লক্ষ লক্ষ মায়ের নাড়ির টান কেউ কাটবে না
ভাইটা কোথায় গেল? কেন মুখটা যাচ্ছি ভুলে
বোনের পরমাগতি তবে রূপনারানের কূলে?

কাকিমা পেট ভরে ভাত খাবে
কাকুর শ্মশানে রাত্রিবাস
দাদুর ঘর হারানোর শান্তি
দিদিমা চুপিচুপি খেল ঘাস

মেয়েরা কাদা ঘাঁটতেই থাকে
ছেলেরা বন্যার জলে স্নান
বমি করে মেয়েগুলো
বাপমায়েরা এখনো ম্লান!

লক্ষ আত্মা শরীর ধরেছে একাত্তরের দিনে
রিফিউজিরাই রাজা। বসেছে যশোর রোডের ঋণে
সূর্য এখন ধূসর। লক্ষ মানুষের বলিদান
এবার মোকাম কলিকাতা। ওরা পূর্ব পাকিস্তান

সেপ্টেম্বরে যশোর রোডের ওপরে ট্যাক্সিগাড়ি
মোষকে দেখছি কয়লা টানতে নতুন রাজার বাড়ি
নতুন বন্যা চুঁইয়ে সতেজ করছে পুরোনো জমি
ঘুঁটেভরা গাছপালা, আর প্লাস্টিকে ছাওয়া ভূমি

ভিজতে ভিজতে হাঁটা, মা-বাপ দৃষ্টির জলে ভেজে
মগ্নমিছিল মৌনদৃষ্টি এখনও কাউকে খোঁজে!
হাড়হাভাতের দলের দেখেছি চোখগুলো বড় বড়
চামড়ার রং কালো। ওরা খ্রিস্টের চেয়ে দড়

দুমড়ে বসে, মায়েরা কাঁদে, পেটের ছেলেটি কেন
বুড়ি সন্নিসি অবুঝ মতো সে, পা-টি রুগ্ন যেন
কচি কচি ওই জোড়হাতে মাখা আমার চোখের জল?
পাঁচ মাস বেঁচে ছিলি? আজ মরবি কিনা বল।

একটা মাদুর, শূন্য কলস – এখানে আমাকে পাবে
হাতটি উঁচিয়ে বাবা চিরদিন জানান দিয়েই যাবে
ওই আমাদের সংরাগ, আর মায়ের অভিজ্ঞান
মায়াকে পাবে না। দেখে যাও এই গহন স্বপনস্নান

তালপাতা ছাওয়া মাটির দাওয়ায় দুটি বাচ্চার চোখ
আমাকে বিঁধছে নীরব চাউনি: সাদা চামড়ার লোক!
রেশনের চাল, মুঠিভরা ডাল সপ্তাহে একবার
সৈন্যসেবিত গুঁড়ো দুধটাও শিশুদের দরকার!

শাকপাতা নেই, টাকাপয়সাও, অথবা একটা কাজ
ভাত খাওয়া চলে চারদিন আরও খিদে পেলে পড়ে বাজ
টানা তিনদিন দানাও পড়েনি ছোট ছোট দুটি মুখে
বমিতে ভাসবে পরের ভাতটা, না খেলে ধৈর্যবুকে

যশোর রোডের মা কেঁদেছেন আমার পায়ের পর
বাঙালি জবানে মিস্টার ওগো একটুকু দয়া কর
খোকার বাপ যে হত্যে দিয়েছে ক্যাম্প অফিসের দোর
ছেঁড়া কার্ড এই মেঝেতে ছড়ানো, পরিচয়হীন ক্রোড়

খোকা খেলা করে আপনমনে, বন্যা বাঁধেন মা
খেলার ছলে কুটিকুটি করা পরিচয় ফেরে না
কাগজ ছাড়া তো রেশন অমিল, কী খাবে মা, বাপ?
আমার পার্সে ছেঁড়াখোড়া সেই নিষ্পাপ অভিশাপ

পুলিশ দুটোকে বন্দি করেছে বাচ্চা হাজার খানেক
পাউরুটি পেতে গলা মিলিয়েছে দৈনন্দিন গানে
হুইসল মুখে বাঁশলাঠি ঠুকে সমঝে চলতে বলা
বাচ্চাগুলোকে জলদি শেখায় ক্ষুধার্তদের কলা

লাফ মেরে তুই লাইন ভাঙলি, সামনে আসবি বলে?
রুগ্ন শুয়ার বাচ্চা আমাকে মূর্খ ভাবলে চলে!
কাদাজল মাখা নাট্যমঞ্চে নেচে যায় দুটি ভাই
হুইসল ফুঁকে পুলিশ দুটিও শিবের গাজন গাই

ছানাপোনাগুলো জটলা বাধায় ঠিক এখানেই কেন
হাসছে খেলছে গুঁতোগুতি করে, দাবিও তুলছে যেন
হাসিখুশি মুখে ভয় মুঠি করে কীসের অপেক্ষা?
কেন এই বাড়ি বাঁধা হয়ে থাকে রুটি বিলোনোর গান?

দরজা খুলে লোকটা বেরিয়ে চিৎকার করে বলে
ছেলেমেয়েদের হাজার কন্ঠ সোচ্চারে দলে দলে
আনন্দ? নাকি প্রার্থনা? ‘আর মিলবে না আজ রুটি’
অট্টহাস্যে হাজার ফুর্তি যেন বলে গেল, ‘ছুটি!’

দুদ্দাড় করে ছুটেছে তাঁবুতে, বুড়োগুলো বসে আছে
রাষ্ট্রের রুটি দেবশিশুরাই এনেছে মুখের কাছে
রুটি ফুরিয়েছে! তবে আজ বিধি ফেরালেন মুখ!
ম্লানমুখে দেবশিশুরা টানছে কাঁচা খিস্তির সুখ।

অনাহার টানা চলতেই থাকে দীর্ঘ দীর্ঘ মাস
হাজার হাজার কঙ্কাল আর দহনযোগ্য শাঁস
পেট ছেড়ে গেছে, শূন্য উদর, সময় লাগে না তাতে
ভাতের মতোই মেলেনি ওষুধ, নার্সও রিক্ত হাতে

রিফিউজিদল আস্তানা গাড়ে আরোগ্য নিকেতন
চোখ ফুটতেই ল্যাংটো শিশুরা খুঁজেছে মায়ের স্তন
পোলিওক্লিষ্ট ক্ষুদ্র শরীর ভরসা শীর্ণ কোলে
হাজার হাজার বিষধর সাপ বাঁশির সুরেই দোলে

সেপ্টেম্বরে রিকশা ছুটছে যশোর রোডের পরে
অর্ধ লক্ষ নগ্ন আত্মা একটি ক্যাম্পে ধরে
বাঁশের খুঁটি মাটির দাওয়া বন্যার জলে ভাসে
খোলা নর্দমা, সিক্ত মানুষ ভাতের তাড়সে কাশে

বন্যার জলে ট্রাক আটকেছে, খাবার বন্দি করা
ওগো আমেরিকা মেশিনদেবতা খাদ্য পাঠাও ত্বরা
আজই হারালে পররাষ্ট্রীয় নীতিগত অঙ্গুলি?
নাকি তোমাদের মেশিনগানেরা শিশুদের করে গুলি?

গেল কোথা সব হেলিকপ্টার, যুক্তরাষ্ট্র এইডের
নেশার দ্রব্য চালানে ব্যস্ত, ব্যাঙ্কক গ্রিন শেডে।
ওগো আমেরিকা বায়বীয় পোত, আলো দেখাবে না তুমি?
নর্থ লাওসে কি দিনমান বোমা ফাটিয়েই যাবে তুমি?

রাষ্ট্রপতির সেনা আমাদের, শুনেছি তারা যা সোনা!
ক্ষমাসুন্দর সাহসী হৃদয় কোটি কোটি যাবে গোনা
তারা আনবে না ওষুধপত্র, খাদ্য, বস্ত্র, ত্রাণ?
নাপাম ফেলেই ভিয়েতনামের বাড়িয়ে চলবে মান?

আমাদের চোখ শুকনো কী করে? যন্ত্রণা পেয়ে কাঁদে?
অরোধ্য এই বৃষ্টিতে নীড় কী করে মানুষ বাঁধে?
যশোর রোডের শিশুরা তাদের বড় বড় চোখ বোজে
আমার বাবাটা মরে গেলে কাল কোথায় ঘুমোব খোঁজে

ভাত কাপড়ের জন্যে আমায় কার কাছে যেতে হবে?
ময়লায় ঘোলা বন্যার জলে শুধু রুটি পেলে হবে?
লক্ষ লক্ষ শিশুরা উতল বর্ষামুখর দিনে
লক্ষ লক্ষ শিশু কেঁদে যায় যশোর রোডের ঋণে

তোমাদের মুখ এখনও বন্ধ, প্রথম বিশ্ববাসী!
এত যন্ত্রণা দেখে কাঁপছ না, প্রেম গেল বুঝি ব্যাসকাশী
তড়িৎযন্ত্রে তৎপর হোক মেশিনের তর্জনী
আমেরিকান মগজে দেবে না ক্ষণিক চেতনা বুনি?

কোথায় হারাল শৈশব, আজ কোথায় এলাম আমি?
এই মেয়েরা কাদের বাড়ির, অশালীন প্রেতগামী?
আত্মার প্রতি লক্ষ রাখিনি, আমার হয়নি যে ঘর ধোওয়া
বন্ধু, সাহসে যে গান ভুলেছ, আজ তাই দিয়ে হাত ছোঁওয়া

কাদায় মাখছে কান্না, পাশেই ছেঁড়াখোড়া এক বাড়ি
পাইপলাইনে রাত্রিযাপন, বৃষ্টিতে ছেঁড়া নাড়ি
কলের জলের জন্য লাইন! এও দেখা ছিল বাকি!
কুঁকড়িয়ে মরে অভুক্ত শিশু, মা জল পায়নি নাকি!

আমি কি এমন কুঁকড়ে মরেছি কোনও বিস্মৃতিলোকে?
আমি কী করব? জিজ্ঞাসা কবি সুনীল গাঙ্গুলিকে
এগিয়ে চলব? দু’চার আনাও পয়সা দেব না আমি?
মাংসমুগ্ধ শরীর আমার কোথা অন্তর্যামী?

এ শহরে কী আসে যায় বলো, গাড়ি বাড়ি করে কারা?
মঙ্গল গ্রহে পদচ্ছাপের মূল্য যায়নি হারা?
লক্ষ মানুষ রাস্তায় বসা পাঁচতারা নিউ ইয়র্ক
ডিনার টেবলে কী পরিবেষণ? ঢিমে রোস্টেড পর্ক

কত সে লক্ষ বিয়রের ক্যান ত্যক্ত পারাবার
মায়েরা মূল্য ঠিকই জানেন, মাতাল সিগার
ভাদরের গ্যাসোলিন আর অ্যাসফল্ট গাড়ি স্বপ্ন
পূতিগন্ধের পৃথিবী আর সাতটি তারার যত্ন

যুদ্ধ থামাও। দীর্ঘশ্বাস ফেলো
এখনো কতটা নুন রয়ে গেছে তোমার অশ্রুজলে
লক্ষ লক্ষ প্রেতের জন্ম তোমাদের আগ্রহে
টিভি খুললেই অভুক্ত খুঁজে পাবেই তোমার ঘরে

কত সে লক্ষ শিশু মরে গেলে তবে,
মা জননীরা দিব্যদৃষ্টি লভেন?
সুনাগরিকের কত কর চোষা বাকি,
গর্বোদ্ধত শিশুহন্তারা কি সেনাপোশাকেও বাপের নজর পাবেন?

আর কত লাখ আত্মারা পাড়ি দেবে
আর কত লাখ শিশুরা তাড়সে কাঁদে
আর কত পরিবারের চক্ষুহারা
আর কতজন দিদিমা প্রেতিনী হবেন?

আর কতজন প্রেয়সী পাবে না রুটি?
আর কতজন কাকিমা জুড়োবে জ্বালা?
আর কত বোন মাথা খুঁড়ে শুয়ে পড়ে?
আর কতজন দাদুও নির্বাপিত?

আর কত বাপ ধুঁকতে ধুঁকতে যাবে?
আর কত ছেলে পথেই হারাল পথ?
আর কত মেয়ে আজও খেল না কিছু?
শীর্ণক্লিষ্ট পা দুটি টেনে টেনে, এ মরুপথ পেরোনো যাবে?

আর কত বাপ ধুঁকতে ধুঁকতে যাবে?
আর কত ছেলে পথেই হারাল পথ?
আর কত মেয়ে আজও খেল না কিছু?
শীর্ণক্লিষ্ট পা দুটি টেনে টেনে, এ মরুপথ পেরোনো যাবে?

সার্থক রায় চৌধুরী


ফটো: ইথান লং


পরিস্থিতি

যেন অপরাধ করে ফেলেছে লাজুক যৌনতা.. পথচলতি মানুষের সামনে
ঘুমন্ত ভিখিরির লিঙ্গ জেগে আছে।

কোনও ভিক্ষা নেই, এক আশ্চর্য মুক্তির স্বাদ বাকিদের ভাবিয়ে তুলেছে..

রাগ, ঘৃণা, বিরক্তি, হাসি, মস্করা, কোনও কিছু তাকে আনত, ন্যুব্জ আর করতে পারছে না…

পুলিশ জানে না লিঙ্গ দাঁড়ানো অপরাধ কিনা.. তারা কিছু বলতে চাইছে না…


বন ফায়ার

সামান্য শস্যের দেশে অসামান্য ক্ষুধা নিয়ে এসেছে টুরিস্ট, ফলে চিকেন চিকেন আরো ডানাওলা ডানাহীন মাছ মাংস মূর্ছনার ভিতর নেচে উঠছে ট্রাইব, এথনিক তারল্যের খোঁজে তোলপাড় হচ্ছে অরণ্যের সামান্য স্পন্দন..

কেঁপে উঠছে জিপের ইঞ্জিন, ডেকচির ঢাকনা, বক্স, ভাঙা ডিম আর পোড়া কিছু ভাতের ভিতরে উঁকি মারছে ভিতু কুকুরের দল

দুখি মানুষেরা এক হলে
কী কী হয়ে যেতে পারে, ম্যানেজার
এখনো জানে না !


ইচ্ছাপত্র

একটা বাড়িতে থাকতে চাই যেখানে থেকে ট্রেন চলে যাওয়ার শব্দ শোনা যাবে। ট্রেন দেখা যাবে, এক বা দুই ঝলক, গাছের ফাঁক দিয়ে
আর হ্যাঁ, একটা পুরোনো, ইটের ঘাটওলা পুকুর থাকবে দুদিকে রোয়াক দেওয়া, বেড়া বরাবর, গায়ে সবুজ ছ্যাতলা পড়া কয়েকটা সুপুরি গাছ, আর একটা ছায়া-পড়া বাগান।

ওপাশে একটা আমবাগান, তার ওদিকে পড়ে যাওয়া কাছারি বাড়ি – সেখানে তক্ষক ডাকবে, সরসর করে সরে যাবে গোসাপের দল আর রাতে শেয়ালের হঠাৎ পালানোর শব্দে হিম-পড়া পাড়া জেগে উঠবে – এ আশা রাখছি না, তবে সীমাদের বাড়ির মতো একটা বাড়ি যেন থাকে – ছাদে মেলা গোলাপি ফ্রকের ডানা
হাওয়ায় উড়ছে…


রূপায়ণ

অরূপ – বেশ্যার ছেলেমেয়েদের পড়ায়। বেশ কিছু টিউশনও করে। ওর স্বপ্ন হল – একদিন বেশ্যালয় থাকবে না।

পিলু – দালাল, অরূপের বন্ধু। ওর স্বপ্ন, ও একদিন দুবাইয়ে দালালি করবে।

নিষাদ – ট্যাক্সি চালায়। ও চায় একদিন ওর নিজের গাড়ির ব্যবসা হবে।

ঋতম – কবি, ও নিরুর কাছে আসে। একটা উপন্যাস লিখতে চায়, যেটা নোবেল পাওয়ার যোগ্য।

রিমি – চাটের দোকান চালায়। ও একটা ক্লাউড কিচেন করার কথা ভাবছে।

পাধি – পুরোহিত। কার্তিক পুজো ওর পছন্দ নয়, ও এ পাড়ায় পাকাপাকি একটা মন্দিরের কথা বলে।

সেজবাবু – গৌতম, সবে পুলিশ জয়েন করেছে। সে চায়, একটা সত্যিকারের ইনভেস্টিগেশন হোক।

নিরু – বেশ্যা, ও একটা আউটবার্স্ট চাইছে..


সম্পাদ্য

যাদের কেউ নেই, তাদের মতো দুজনের
মুখোমুখি দেখা হলে ভয়াবহ আক্রোশে?
নাকি, কোনও তীব্র আকর্ষণে একে অপরের দিকে ছুটে যায় তারা!

যেমন, একটি চুম্বকের উত্তর আর দক্ষিণ মেরু।

যাদের কোনোদিন দেখাই হবে না।

রাত । একরাম আলি

পুরনো জানালাগুলি ভাঙা ভালোবাসার মতন
তবু তাতে দেখি ভোর, আকাশের দিকপরিবর্তন

যখন বিদ্যুৎ যায়, আঁধার যখন
প্রকৃতির মতো লম্ফে কেঁপে ওঠে মন

আলো যত, ধোঁয়া বেশি; সমস্বরে কাশে
কুয়াশা সাঁতরে শিখা থেমে-থেমে আসে

রাতের দারিদ্রে একা লম্ফটি জ্বলে
ছোট্ট শিখা, একাকিত্বে নিভু-নিভু ঘরের অতলে

ভ্রমণ । ঝিলম ত্রিবেদী

চারিদিক
ধু ধু
তোমার চোখের মতো শুধু
ভাঙা আঙুলের মতো
ভেঙে যাওয়া সন্তানের মতো
চারিদিক
শুধু

নদীর জলের কাছে সংসার দাঁড়ালে হঠাৎ
প্রবাহ ওঠে না কোনও
স্থির এক শান্ত আঘাত
দুটি মুখ
জল দিয়ে এঁকে রাখা স্তনভার
রোদে
পুড়ে যায় সংসার!

চাঁদ লেগে থাকা দোকানিরা
বহতা কড়াই
শিশিরের বন থেকে ফিরে আসে লাজুক ছেলেটি
গান
গায়
চঞ্চল ক’রে তোলে হাত
মেয়েটি আকাশি রং, মেয়েটিও পুজো নিতে চায়

পাটনী
একলা
দেখে

বিড়ি খায়, ধোঁয়া ওড়ে একা

নিভন্ত
ছেলে মেয়ে
সংসার ছেড়ে এসে নৌকোয় সংসার করে

যযাতি । বিশ্বজিৎ পণ্ডা

এবারও তোমার সঙ্গে দেখা হল না।
ঘূর্ণির ভেতরে
কোথায় তলিয়ে গেলাম! সেখানে তো তুমি নেই।
যদি থাকতে, আমি শুধু জানতে চাইতাম ‘কেন’?
কেন এই নিরঞ্জন? বিপরীতগামী কালচক্র?
সন্তান যদি এই তারুণ্য প্রত্যাখ্যান করে,
তখন কী হবে? ঘূর্ণির ভেতর পড়ে
কোথায় তলিয়ে গেলাম – সেখানে আমার
জরাবৃদ্ধ সন্তানসন্ততি মারামারি করছে। সেখানে তুমি নেই।
অতীত থেকে নির্গত যে আলোকরশ্মি ভবিষ্যৎকে
স্পর্শ করছে, সেখানেই ঘর বেঁধেছিলাম –
তার নাম কলিকাতা শহর – এখানে সবাই সবাইকে
চেনে – রেশন তুলতে যায়, মেট্রো রেলে
ছাতা ফেলে আসে, দালাল ধরে আর.জি. করে
গিয়ে মরে – এখানেও তুমি নেই।
এবারও, তোমার সঙ্গে দেখা হল না।

আমার মাস্টারমশাই । সন্দীপন চক্রবর্তী

সালটা বোধহয় ১৯৯৭-৯৮। সামনেই পার্ট ওয়ান পরীক্ষা। কিচ্ছু পড়াশোনা হয়নি। ফলে নিশ্চিত যে পরীক্ষা দেওয়া হবে না। কী করেই বা হবে! সারাক্ষণ কবিতা নিয়ে আড্ডায় মেতে অছি। একটা ধারণা জন্মেছে যে, এইসব ফালতু একাডেমিক পড়াশোনা অসার; এসব করে কোনও লাভ হয় না। ওদিকে ঘনিষ্ঠ কবিবন্ধুরা কেউ স্নাতকস্তরের ফাইনালে গিয়ে ছেড়ে দিচ্ছে কলেজ, কেউ বা পুরো ডাক্তারি পড়েও তার ফাইনাল পরীক্ষা দিচ্ছে না। ফলে আমায় নিয়ে হাল ছেড়ে দিয়েছে বাড়ির লোকেও। কিন্তু আশ্চর্যভাবে হাল ছাড়েননি কলেজের এক মাস্টারমশাই।
          তাঁর এক আশ্চর্য পক্ষপাত এই ছাত্রের প্রতি – তার কারণ ছাত্রটি সাহিত্য ভালোবাসে, কবিতা লেখে। কাজেই এত সহজে তার জীবন এলোমেলো হয়ে যেতে দেবেন না তিনি। তাই সপ্তাহে দু-তিন দিন করে কলেজের পর, তিনি চলে আসেন ছাত্রের বাড়ি। খানিকক্ষণ সাহিত্য বা কবিতা নিয়ে গল্প চলে, ছাত্রকে বুঝিয়েসুজিয়ে পড়তে বসান এবং পড়ান প্রায় ঘন্টা দুয়েক। তারপর ফিরে যান বাড়ি। অথচ এই ছাত্রকে পড়ানোর জন্য তার বাবা মা কিছু সাম্মানিক দিতে চাইলেও, সবিনয়ে তা প্রত্যাখ্যান করেন। আজ মনে হয়, কী দায় পড়েছিল তাঁর! এই উপযোগিতা-সর্বস্ব যুগে খামোখা নিজের অর্থ, শ্রম, সময় ব্যয় করে, নিজের কোনও লাভ নেই জেনেও, কেন তিনি আসতেন এইভাবে? শুধুমাত্র একটা কুঁড়ি যাতে যত্নের অভাবে শুকিয়ে না যায়, সেই দায় থেকে? নিজেই তবে এইভাবে যেচে ঘাড়ে তুলে নিতে হয় দায়? এটাই কি শেখাতে চেয়েছিলেন তিনি?
          এই শিক্ষকের নাম – স্বপন পণ্ডা। তিনি নিজেও বাংলা সাহিত্যের এক গুরুত্বপূর্ণ গদ্যকার। কিন্তু তার চেয়েও বেশি করে তিনি আমার মাস্টারমশাই, যাঁর কাছ থেকে আমি শুধু পড়াশোনার নয়, জীবনের পাঠ পেয়েছি। মানুষের কীরকম হওয়া উচিত, সেটা বুঝেছি। এমনকি অনেক পরেও, সাহিত্য বা অনুবাদ নিয়ে এখনও তাঁর থেকে নানা পরামর্শ চেয়ে থাকি। তবে ছাত্রের মতো করে নয়, বরং বন্ধুর মতো করেই বরাবর তিনি মিশেছেন আমার সঙ্গে। তর্ক করেছি, ঝগড়া করেছি কত! কিন্তু তাতে তাঁর ভালবাসায় ঘাটতি পড়েনি কখনো। এইসব শিক্ষক পেয়েছি বলেই হয়তো সামান্য কিছু শেখার চেষ্টা করেছি জীবনে। হয়তো পারিনি পুরো শিখতে। কিন্তু এই চেষ্টার দিকেই তো এগিয়ে দেন একজন প্রকৃত শিক্ষক।

Decorative image

বিজ্ঞাপন সহযোগী ডিজে কুমার অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটসের সৌজন্যে

বাংলা শব্দ। তাপস দে
গ্রাম : পারুলডিহি। ডেবরা, পশ্চিম মেদিনীপুর থেকে সংগৃহীত। নভেম্বর ২০২৫।

হিড়      আল।
চাখর      বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ ও কনিষ্ঠ আঙুলের দূরত্ব।
দাঁ      দা।
হাসুয়া      বড় দা, কিন্তু দায়ের দাঁত থাকে না।
ঘনি      মাছ ধরার উপকরণ। বাঁশ, কঞ্চি নির্মিত।
মুগরি      ভি-আকৃতির মাছ ধরার উপকরণ। বাঁশ, কঞ্চি নির্মিত।
টুবি      ডোবা।
গোইল      গোয়াল ঘর।
ঠাকা      ছোট ঝুড়ি।
মটকা      শীর্ষ।
ধুচুনি      চাল ধোয়ার জন্য বাঁশের তৈরি সছিদ্র পাত্র।
মুথুন      দুটো খড়ের চালের সংযোগস্থল।
কাঁদাল      বাড়ির পেছন দিকের জায়গা।
তলতা/তল্লা বাঁশ      তরল বাঁশ।
পতলি      ধান ও খড়ের মণ্ড।
গুয়াশাল      গোয়াল ঘর।
বদা      পাঁঠা।
ছেনা      বাচ্চাকাচ্চা।
ম্যাখ      লম্বা খুঁটি।
তাড়া      বাঁশের মোটা লাঠি।
মাড় ধরানো      গরু প্রজনন করানো।
আকড়া      ধানের ভুসি।

আদিখ্যেতা। সপ্তর্ষি মণ্ডল

এক ছিল তিতির পাখি, বাঁদর আর হাতি। ঘন বনের ভেতর এক বট গাছ, তিতির আর বাঁদর সেখানে থাকে। সারা দিন বনে ঘুরঘুর করে হাতি বিকেল বেলা বটের ছায়ায় বসে হাওয়া খায়। একদিন বিস্তর হাওয়া খেয়ে, পেটে শুঁড় বুলিয়ে, মাথা নেড়ে হাতি বললে, ‘এই যে আমরা আপনি-আজ্ঞে করি, এটা আমার ভাল বোধ হয় না। আমাদের মধ্যে কে বড়? ছোটবেলায় বট গাছের মগডালের পাতা আমার পেটের নিচে সুড়সুড়ি দিত। কী আরাম! তালে কি আমিই বড়?’ বাঁদর বললে, ‘ছোটবেলায় মায়ের সঙ্গে বট গাছের মগডালে বসেছি, ফল ছিঁড়ে খেয়েছি। তালে কি আমিই বড়?’ তিতির বললে, ‘এই বন পেরিয়ে উত্তরের দিকে আর একটা বনে এমনি একটা গাছ ছিল। সেখানে ফল খেতাম, উড়ে বেড়াতাম। একদিন এখানে এসে পেটটা মোচড় দিয়ে উঠল। সাফসুতরো দেখে, বসে হালকা হলাম। মনে হয়, ওই গাছের বীজ থেকেই এই গাছটা হল।’
          হাতি আর বাঁদর বললে, ‘তাই ত, তালে তিতির পাখিই বড়। আচ্ছা এখন থেকে আমরা তিতিরকে রামা বলে ডাকব, রামা তুই বলব, রামার পরামর্শ শুনব।’ তিতির বললে, ‘তবে তাই হোক।’
          দিনভর তিতির গাছে গাছে ঘোরে, টি-টি করে ডাকে, খবর আনে : ওই গাছে ফল পেকেছে, ওই গাছে কচি পাতা ধরেছে, ওই গাছের ফুলে বিষ। হাতি আর বাঁদর, রামার কথা শুনে চলে। তারা রামা বলতে অজ্ঞান।
          একদিন অসহ্য গুমোট। গাছ থেকে হলকা ছুটছে। পাতায় পাতা ঘষে ফুলকি উঠছে। তিতির উড়ে গেল হাতি আর বাঁদরের কাছে। বললে, ‘বনে আগুন লাগতে দেরি নেই। এখুনি উত্তর দিকে পাড়ি দিন। একটা নদী পড়বে। নদীর গায়ে আর একটা বন, আর একটা বট গাছ। সেখানে গিয়ে উঠুন, দেরি করবেন না।’ হাতি আর বাঁদর বললে, ‘তবে তাই হোক। কিন্তু রামা, তুই যাবি না?’ সে বললে, ‘যাব। অন্যদেরও বলতে হবে কথাটা। আমি আসছি।’ তাকে জলদি আসতে বলে হাতি আর বাঁদর পথ ধরল।
          নতুন গাছে আস্তানা গাড়ার পর এক দিন গেল, দুই দিন গেল, তিন দিন গেল। তিতির নেই। পোড়া পোড়া গন্ধ। হাতি আর বাঁদর বসে থেকে থেকে বিরক্ত। হাতি বললে, ‘কী দরকার ছিল অন্যদের খবর দেওয়ার? রামাটা বড় বোকা।’ বাঁদর বললে, ‘বোকা না ছাই, রামাটা ভিতু। ওর ভয়, অন্যরা পুড়ে মরবে। দেখুন গে, সে এতক্ষণে নিজেই পুড়ে মরেছে।’
– ‘ভিতু হলে কি কেউ আগুনে ঝাঁপ দিতে যায়? ভিতু নয়, রামা বোকা।’
– ‘বোকা হলে কি কেউ পথ চিনতে পারে, নাকি নিজে না গিয়ে অন্যকে চিনিয়ে দেয়? বোকা নয়, রামা ভিতু।’
তাদের তর্ক থামেই না, হাঁপাতে হাঁপাতে তিতির এসে হাজির। ডানায় ছ্যাঁকা লেগেছে, চোখে ধোঁয়া দেখছে, ঠোঁট ভেঙে গেছে। তাকে জলটল দিয়ে, হাতি জিজ্ঞেস করল, ‘আচ্ছা রামা, তুই বোকা, না রে?’ তিতির বললে, ‘হ্যাঁ তাই ত।’ অমনি বাঁদর বলে উঠল, ‘উঁহু, রামা, ভুল বললি। তুই ভিতু, না রে?’ তিতির বললে, ‘হ্যাঁ তাই ত।’ হাতি আর বাঁদর রেগে গিয়ে বললে, ‘এ আবার কেমন ধারা কথা হল? ঠিক করে বল, আসলে তুই বোকা না ভিতু?’ তিতির বললে, ‘আসলে আমি কেউ না।’
          যেই না বলা, কোত্থেকে একটা সাপ এসে সড়াত করে গিলে ফেলল রামাকে। উব্‌বৌ করে একটা ঢেঁকুর তুলে বলল – ‘যত্তসব আদিখ্যেতা!’। বলেই ঢুকে পড়ল কোটরে। বাঁদর আর হাতি কী আর করে, বসেই থাকল।


বিজ্ঞাপন সহযোগী ডিজে কুমার অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটসের সৌজন্যে

হাজারি চক্রবর্তী (জুনিয়র)

কাঁচকলা ডুমো ডুমো করে কেটে খোসাটা ফেলে দাও নাকি? অমন চিন্তাও করতে নেই। খোসাগুলো কুচিকুচি করে কাটো। কালো জিরে দাও। রসুনের কটা কোয়া ফেলে দাও। দু-একটা শুকনো লঙ্কা। দু-চার দানা চিনি, ব্যাস। বেশ করে বেটে নাও। শিলে, নইলে মিক্সিতে।
          কড়াইতে সর্ষের তেল দাও। গরম হলে, আঁচ কমিয়ে খোসাবাটা নেড়েচেড়ে নাও। মিনিট পাঁচেক। হল? গরম গরম ভাতে মেখে খাও দিকি! খেলে শরীরে রক্ত বাড়ে, জানো?
          শ্রীসর্বাণী চট্টোপাধ্যায় মনে করিয়ে দিলেন, পটলের খোসা, ফুলকপির পাতাও এইভাবে করা যায়। খেতে দারুণ লাগে।
          শ্রীকাকলি পণ্ডা বললেন, এইভাবে তো ঝিঙের খোসাও বাটা খায়! আপনি খাননি?

জয়গুরু ।।

ড্রাইভার। অলকা সাহা


শিল্পী: মালঞ্চ সেন

পইপই করে বলেছি, মুখ বন্ধ রাখবে। যেখানে সেখানে হাঁউমাউ করে যা ইচ্ছে তাই বকে যাওয়া, এ কী?

কথা শোনা তো ধাতে নেই। জম্মের পর মুখে মধুও জোটেনি।

মাকে দেখতে হাসপাতালে যাব, সাত সকালে হাতমুখ ধুয়েই গাড়ি বুক করেছি। পরিস্কার পরিচ্ছন্ন গাড়ি, বাজেটের মধ্যে, উঠে বসতেই ড্রাইভার গান চালিয়ে দিল। সাউন্ডটা কী সুন্দর! ওই যে দুটো ছেলে যত্ন করে রবীন্দ্রসঙ্গীত অ্যারেঞ্জ করে, সেই গান। কী ভাল না?

আড়চোখে দেখলাম, মুখে সিগারেট ঝুলিয়ে পকেটে দেশলাই হাতড়াচ্ছে। ‘দাঁত মাজার পর পাঁচ মিনিটও কাটল না যে।’ জবাব দিল না। এত্ত অসভ্য!

গাড়ি বড় রাস্তায় উঠেছে কি ওঠেনি, শুরু হল বক্তব্য পেশ করা। ‘দেখো, দুটো গানের দুটোতেই লয়ের কোনও কারবার নেই। রবীন্দ্রনাথ কি লয়টয়ের বিশেষ তোয়াক্কা রাখতেন না?’ খোঁচাটা দেখুন। টেনে হিঁচড়ে হেসে বললাম, ওরা নিজেদের মতো করে চেষ্টা করছে করুক না। একটু কিছু বদল হবে না?

বলাটাই কাল হল। শুরু হল ধারাবিবরণী। ‘বদল? লয়ে হস্তক্ষেপ করলি, র‍্যাঁদা মেরে একটা আস্ত গাছকে দাঁতখড়কে বানিয়ে দিলি, কথা সুরটাই বা বাদ যায় কেন? করে ফেল, দেখে যাই! নইলে মুরোদ থাকলে গান লিখে সুর দিয়ে চোঙা ফুঁকে বেড়া। দেখি কটা লোকে শোনে!’ হুসহুস করে ধোঁয়া ছাড়ছে আর বকে চলেছে। আচ্ছা গাড়িতে আরও একটা লোক নেই কি? তার হয়তো ভাল লাগে এই গান, কথাগুলো তার মুখের ওপর না বললেই নয়?

কখন বাগবাজার চলে এসছে খেয়াল করিনি। গাড়ি থেমে গেল। ড্রাইভার বলল দিদি গাড়ি আর টানতে পারছে না। আপনারা এখানে অন্য গাড়ি পেয়ে যাবেন। আমার এই পর্যন্ত ভাড়া দিলেই হবে। আমি বোকার মতো টাকা দিয়ে নেমে এলাম।

মাল দেখি আগেই নেমে পড়ে, আমার দিকে হাঁ করে তাকিয়ে আছে, আর পকেট হাতড়াচ্ছে। ব্যাগট্যাগ সামলে যেই বলেছি, হল তো, শান্তি হয়েছে তো এইবার? শয়তানটা বলে কী, ‘রবীন্দ্রনাথ আমাকে গাড়ি থেকে নামিয়ে দিলেন!’

সম্পাদক : বিশ্বজিৎ পণ্ডা
D 8/15 করুণাময়ী হাউজিং এস্টেট
সল্ট লেক, কলকাতা 700091
ইমেল : deyala.org@gmail.com

দেয়ালা নামাঙ্কন : সায়মজ্যোতি বন্দ্যোপাধ্যায়
নামাঙ্কন সহযোগিতা : শুভেন্দু সরকার
অলঙ্করণ : কৌস্তুভ বন্দ্যোপাধ্যায়
অলঙ্করণ পরিকল্পনা : বিশ্বজিৎ পণ্ডা

বিজ্ঞাপন সহযোগী ডিজে কুমার অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটসের সৌজন্যে

দেখা হয়েছে: বার

5 1 vote
Article Rating
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x