আমার মাস্টারমশাই । সন্দীপন চক্রবর্তী
সালটা বোধহয় ১৯৯৭-৯৮। সামনেই পার্ট ওয়ান পরীক্ষা। কিচ্ছু পড়াশোনা হয়নি। ফলে নিশ্চিত যে পরীক্ষা দেওয়া হবে না। কী করেই বা হবে! সারাক্ষণ কবিতা নিয়ে আড্ডায় মেতে অছি। একটা ধারণা জন্মেছে যে, এইসব ফালতু একাডেমিক পড়াশোনা অসার; এসব করে কোনও লাভ হয় না। ওদিকে ঘনিষ্ঠ কবিবন্ধুরা কেউ স্নাতকস্তরের ফাইনালে গিয়ে ছেড়ে দিচ্ছে কলেজ, কেউ বা পুরো ডাক্তারি পড়েও তার ফাইনাল পরীক্ষা দিচ্ছে না। ফলে আমায় নিয়ে হাল ছেড়ে দিয়েছে বাড়ির লোকেও। কিন্তু আশ্চর্যভাবে হাল ছাড়েননি কলেজের এক মাস্টারমশাই।
তাঁর এক আশ্চর্য পক্ষপাত এই ছাত্রের প্রতি – তার কারণ ছাত্রটি সাহিত্য ভালোবাসে, কবিতা লেখে। কাজেই এত সহজে তার জীবন এলোমেলো হয়ে যেতে দেবেন না তিনি। তাই সপ্তাহে দু-তিন দিন করে কলেজের পর, তিনি চলে আসেন ছাত্রের বাড়ি। খানিকক্ষণ সাহিত্য বা কবিতা নিয়ে গল্প চলে, ছাত্রকে বুঝিয়েসুজিয়ে পড়তে বসান এবং পড়ান প্রায় ঘন্টা দুয়েক। তারপর ফিরে যান বাড়ি। অথচ এই ছাত্রকে পড়ানোর জন্য তার বাবা মা কিছু সাম্মানিক দিতে চাইলেও, সবিনয়ে তা প্রত্যাখ্যান করেন। আজ মনে হয়, কী দায় পড়েছিল তাঁর! এই উপযোগিতা-সর্বস্ব যুগে খামোখা নিজের অর্থ, শ্রম, সময় ব্যয় করে, নিজের কোনও লাভ নেই জেনেও, কেন তিনি আসতেন এইভাবে? শুধুমাত্র একটা কুঁড়ি যাতে যত্নের অভাবে শুকিয়ে না যায়, সেই দায় থেকে? নিজেই তবে এইভাবে যেচে ঘাড়ে তুলে নিতে হয় দায়? এটাই কি শেখাতে চেয়েছিলেন তিনি?
এই শিক্ষকের নাম – স্বপন পণ্ডা। তিনি নিজেও বাংলা সাহিত্যের এক গুরুত্বপূর্ণ গদ্যকার। কিন্তু তার চেয়েও বেশি করে তিনি আমার মাস্টারমশাই, যাঁর কাছ থেকে আমি শুধু পড়াশোনার নয়, জীবনের পাঠ পেয়েছি। মানুষের কীরকম হওয়া উচিত, সেটা বুঝেছি। এমনকি অনেক পরেও, সাহিত্য বা অনুবাদ নিয়ে এখনও তাঁর থেকে নানা পরামর্শ চেয়ে থাকি। তবে ছাত্রের মতো করে নয়, বরং বন্ধুর মতো করেই বরাবর তিনি মিশেছেন আমার সঙ্গে। তর্ক করেছি, ঝগড়া করেছি কত! কিন্তু তাতে তাঁর ভালবাসায় ঘাটতি পড়েনি কখনো। এইসব শিক্ষক পেয়েছি বলেই হয়তো সামান্য কিছু শেখার চেষ্টা করেছি জীবনে। হয়তো পারিনি পুরো শিখতে। কিন্তু এই চেষ্টার দিকেই তো এগিয়ে দেন একজন প্রকৃত শিক্ষক।
বিজ্ঞাপন সহযোগী ডিজে কুমার অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটসের সৌজন্যে
দেখা হয়েছে: ০ বার