শৌটীরবাবু
অমিতকুমার ঘোষ

অবসরপ্রাপ্ত বিভাগীয় প্রধান। রাশিবিজ্ঞান বিভাগ, সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ, কলকাতা।

গোড়ায় দুটো কথা বলে নেওয়া ভাল। প্রয়াত অধ্যাপক শৌটীর কিশোর চট্টোপাধ্যায় জ্ঞানে, কর্মে, মনস্বিতায় ও সহৃদয় ব্যক্তিত্বে সমুজ্জ্বল এমন একজন মানুষ, যাঁর স্মৃতিচারণ দুরূহ কাজ। দ্বিতীয়ত, রাশিবিজ্ঞানের বিস্তৃত ক্ষেত্রে তাঁর অবাধ বিচরণ ও স্মরণীয় অবদান সম্বন্ধে আমার জ্ঞান বড় সীমিত। তাঁর সুযোগ্য সহ-অধ্যাপকমণ্ডলী ও কৃতী, গবেষক ছাত্রছাত্রীরাই এই বিষয়ের বিচার বিশ্লেষণের যথার্থ অধিকারী।
          নানা কাজে, নানা সময়ে শৌটীরবাবুর সান্নিধ্যে যাঁদের আসার সৌভাগ্য হয়েছিল, তাঁরা বুঝেছেন – পাণ্ডিত্য ও বৈদগ্ধের প্রভেদ কোথায় – কোথায় প্রভেদ বুদ্ধি ও প্রজ্ঞায়, কর্মে ও অনুশীলনে, বিদ্যাচর্চা ও সারস্বত সাধনায়। রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, এই প্রভেদজ্ঞানই যথার্থশিক্ষা।
          একদা শান্তিনিকেতন আশ্রমে পণ্ডিত ক্ষিতিমোহন সেন, অথবা, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গনে আচার্য সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায়, ডঃ শশিভূষণ দাশগুপ্ত, আচার্য সত্যেন্দ্রনাথ বসু প্রমুখ স্বনামধন্য শিক্ষকরা অধ্যাপনা-গবেষণার যুগ্ম ধারার ক্ষেত্রে যে মরমী বঙ্গীয় ঐতিহ্যের জন্ম দিয়েছিলেন – নিঃসংশয়ে বলা যায়, সাম্প্রতিক কালে সেই ঘরানারই অন্যতম উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক ছিলেন SKC। মনীষার নিত্য বর্ষণে, স্মিত হাস্যে, মৃদু আলাপচারিতায় ও অনাড়ম্বর জীবনশৈলীতে সতত উজ্জীবিত করে গেছেন সহকর্মী, গবেষক ও ছাত্রছাত্রীদের।
          ‘সহবত’ শব্দটি বাংলা ভাষায় সুপ্রচলিত, যদিও এটি আরবি শব্দ। আভিধানিক অর্থ: ব্যক্তির সান্নিধ্য বা সংসর্গ–জনিত প্রত্যক্ষ শিক্ষা। ভারতবর্ষের চিরায়ত ঐতিহ্য অনুসারে – যথার্থ সারস্বত সাধনায় যোগ্য পথ-প্রদর্শক তিনিই হন, যিনি তত্ত্বচর্চা ও জীবনযাপন এই দুই মার্গকে অভেদ জ্ঞান করেন। উভয় ক্ষেত্রেই তাঁর তন্ময়তা শিক্ষার্থীদের একাধারে ঋদ্ধ ও মুগ্ধ করে। SKC-র সারস্বত সাধনা এই গোত্রের।
          যে কোনও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের বিচারে, শৌটীরবাবুর গভীর মনঃসংযোগ ও অনুপুঙ্খ বিচারের রীতিটির সঙ্গে আমাদের সকলেরই অল্প-বিস্তর পরিচয় আছে। তবে, এক্ষেত্রে তাঁর স্বকীয়তার বিশেষ পরিচয় মেলে – বিচার্য প্রশ্নটিকে গোড়াতেই, তার পরিপ্রেক্ষিতে উপস্থাপনার আশ্চর্য ক্ষমতায়। তখন, পরবর্তী ধাপে সমাধান সূত্রের অন্বেষণ অনেক সহজসাধ্য হয়ে ওঠে। বিশিষ্ট কোয়ান্টাম পদার্থবিদ রিচার্ড ফাইনম্যান তাঁর ছাত্রদের বলতেন, কোনও প্রশ্নের নিখুঁত উপস্থাপনাই, তার সমাধান প্রক্রিয়ার পঞ্চাশ শতাংশ। প্রথমটি উৎসারিত হয় intuition থেকে। আর দ্বিতীয়টি প্রসৃত হয় intelligence থেকে। এই অভিজ্ঞা আমাদের অন্তরে সঞ্চারিত করার মহৎ সাধনায় ব্রতী ছিলেন পরম শিক্ষক শৌটীর কিশোর চট্টোপাধ্যায়।
          মনীষার একটি সাধারণ লক্ষণ হল, জ্ঞানের বিশেষ শাখার সীমানাকে প্রশ্ন করা ও প্রয়োজন বোধে তাকে অতিক্রম করে যাওয়া – সমন্বয়ের বৃহত্তর স্বার্থে। এই প্রসঙ্গে শৌটীরবাবুর শেষের দিকের গবেষণামূলক একটি গ্রন্থের উল্লেখ করা যেতে পারে – যেখানে তিনি পরীক্ষা করেছেন, বেদান্ত দর্শনের ‘চৈতন্যরূপী’ মানুষের সংজ্ঞার প্রেক্ষিতে ও রাশিবিজ্ঞানের ভিত্তিতে এক ভিন্নমাত্রার ‘মানব-উন্নয়ন সূচক’ নির্মাণের বিষয়টি। সম্ভবত নৈয়ায়িক ও বৈদান্তিক মননের সমন্বয় সাধনের এক অভিনব প্রয়াস হিসেবে এই পরীক্ষাটিকে দেখা যেতে পারে।
          ২০০৩ সালে অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস থেকে প্রকাশিত হয় SKC-র Statistical Thought: A History and Perspective গ্রন্থটি। রজার পেনরোজ, স্টিফেন হকিং প্রমুখ বিশিষ্ট আধুনিক বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন যে, যথার্থ দার্শনিকের দৃষ্টিকোণ ছাড়া বিজ্ঞানের ইতিহাস রচনা, পঞ্জিকার শুষ্ক দিনলিপি হয়ে উঠতে পারে। সেদিক থেকে, এই ইতিহাস গ্রন্থটি অবশ্যই ব্যতিক্রমী রচনা। ওই সময় যাঁরা তাঁর সংস্পর্শে এসেছেন, তাঁরা জানেন, কী গভীর অধ্যবসায় ও মননের ফসল এই আকর গ্রন্থটি। বিজ্ঞানের নানা শাখা, গণিতশাস্ত্র ও নানাবিধ অবেক্ষণের জঠরে রাশিবিজ্ঞানের যে ভ্রুণ সৃষ্টি হয়েছিল – তা কীভাবে, কয়েক শতাব্দীর ব্যবধানে, নাড়ি ছিন্ন করে, শিশু আকারে ভূমিষ্ঠ হল ও ক্রমে যৌবনপ্রাপ্তির মধ্য দিয়ে এক নবীন বিজ্ঞানরূপে নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠা করে নিল – তারই এক অনুপুঙ্খ বিবরণ ও বিশ্লেষণ আছে এই গ্রন্থে। আজ যখন বিশ্বজুড়ে মেশিন লার্নিং, নিউরাল নেটওয়ার্ক, ডেটা সায়েন্স, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স প্রভৃতি অত্যাধুনিক বিজ্ঞানের শাখাগুলির সঙ্গে, আদান প্রদানের মধ্য দিয়ে, রাশিবিজ্ঞান নবকলেবর ধারণ করছে, সেই সন্ধিক্ষণে, রাশিবিজ্ঞানীর আত্মপরিচয়, আত্মসমীক্ষা ও আত্মবিশ্বাস প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে এই গ্রন্থের পুনর্পাঠ ও পুনর্মুদ্রণ প্রয়োজন।
          কথা শেষ করব, প্রাচ্যের এক মহর্ষির উদ্ধৃতি দিয়ে। প্রাচীন চিনের পরিব্রাজক-দার্শনিক লাওৎ-সে, যথার্থ প্রাজ্ঞ ব্যক্তি সম্পর্কে যা বলেছিলেন – ইংরাজি ভাষান্তরে তা এই রকম:

‘Because he does not display himself,
People can see his light.
Because he has nothing to prove,
People can trust his words.
Because he has no goal in mind,
Everything he does, succeeds.’

(২৬ জুন ২০২৪ সালে, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাশিবিজ্ঞান বিভাগে প্রদত্ত ভাষণের ভিত্তিতে লিখিত)

দেখা হয়েছে: বার

5 1 vote
Article Rating
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x