মাস্টারমশাই
কৌস্তুভ বন্দ্যোপাধ্যায়

পুত্রাৎ শিষ্যাৎ পরাজয়ে গৌরবের হানি হয় না নাকি। বাবার মনে কিন্তু বিলক্ষণ দাগা লেগেছিল, যখন অঙ্কের খাতাটা কোলের ওপর ছুঁড়ে বলেছিলাম – দেখো, দেখো, তুমি যা বললে তাই করলে অঙ্ক মিলছে না। খাতাটা নিয়ে চুপ করে বসে রইল, মুখটা ঘোরাল অন্য দিকে। খারাপ লাগল। কিন্তু, তীর যে লক্ষ্যে পৌঁছে গেছে!
          শ্রীপ্রকৃতিকুমার শূর পড়ার টেবিলে আবির্ভূত হলেন, এর কিছুদিন পরে। ক্লাস ফাইভের হাফ ইয়ার্লি হয়ে গেছে। কানে লেগে থাকার মতো একটি বিচিত্র গলা খাঁকারি শুনে চমকে উঠে টেবিলের ওপর মাথা উঁচিয়ে দেখলাম, প্রায় কৃষ্ণবর্ণের কাঁচওয়ালা অদ্ভুত চশমাধারী গম্ভীর একটি মানুষ আপিসের এই এত মোটা একটা ব্যাগ টেবিলের ওপর ধপ করে রাখলেন, এক ঝলক চাইলেন, ব্যাগ হাতড়ে বের করলেন এক প্যাকেট চার্মস, দেশলাই বাক্স। পরম যত্নে, সিগারেট প্যাকেটের ওপর দেশলাই রাখা হল। ব্যাগ টেবিল থেকে মেঝেতে গেল, পিছুপিছু চায়ের কাপ হাতে মা এল, চায়ে চুমুক দিয়ে কেশব নাগের কতগুলো মার্কামারা অঙ্ক কষতে দিয়ে মাস্টারমশাই টেবিলে তবলার বোল তুলতে লাগলেন।
          মিহি করে বললাম, হয়ে গেছে মাস্টারমশাই। আবার এক ঝলক চাউনি, খাতাটি নিয়ে এই বার শুরু হল রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ। পাঁচ মিনিট পর দেখা গেল সাদা কাগজের ওপর পেনসিলে লেখা হরফগুলো লাল কালির কারেকশনে ভর্তি। কাটাকুটি শুধু অঙ্কে হয়নি, লক্ষ্যণীয়ভাবে হয়েছে অঙ্ক সমাধানের ভাষাতেও। সেগুলো কেন দরকারি, সেইটে ছাত্রকে বুঝিয়ে পরিশেষে একটি মর্মভেদী বাক্য : বাংলা তো আমাদের মাতৃভাষা, নয় কি? উপরি পাওনা, একটি ফিচেল হাসি। বোঝা গেল, ইনি হাসতেও জানেন।
          সেই শুরু। আকাশের দেবতা যত প্রকার সংগ্রহযোগ্য অঙ্কের বই সৃষ্টি করে কলেজ পাড়ার পুরনো বইয়ের দোকানের জঠরে গচ্ছিত রেখেছেন, সেই সমস্ত অঙ্কের বই যোগাড় করা শুরু; প্রতিটি বই কেন কীহেতু অন্য বইয়ের চেয়ে বিশিষ্ট তার ব্যাখ্যা, টীকাসমেত ছাত্রের হৃদয়ে গেঁথে দেওয়ার শুরু; অঙ্কের সমাধানপর্ব শুরু; যে অঙ্ক আটকে যাবে সেই অঙ্কের সামনে সশরীরে খাড়া হয়ে আক্ষরিক অর্থে সেলাম বাজানোর শুরু; আর সবার উপরে যথোপযুক্ত সময়ে মান্না দে-র সেই অমর গানগুলির পুনরাবৃত্তির শুরু :‘হৃদয়ের গান শিখে তো গায় গো সবাই/কজন আর হৃদয় দিয়ে গাইতে জানে’ কিংবা, ‘হৃদয়ে লেখো নাম, সে নাম রয়ে যাবে’।আজও এই গান আমার কাছে তপস্যামগ্ন কোনও বিরহী যক্ষ নয়, শ্রীপ্রকৃতিকুমার শূরের ছবি জাগিয়ে তোলে।
          যে শুধুই ক্রিকেট জানে, সে ক্রিকেটের জানেটা কী? বলেছিলেন এক বিখ্যাত ক্রিকেটরসিক। একই যুক্তিক্রমে, যে অঙ্ক জানে, সে কি ব্যাকরণ জানবে না? শব্দছক করবে না? ভ্রমণলিপ্সু হবে না? যে শুধুই অঙ্ক জানে সে কি হৃষীকেশ মুখোপাধ্যায়ের আনন্দ চলচ্চিত্রের রসগ্রহণে ব্যর্থ হবে? মোচার ঘণ্ট কী কী অনুপানযোগে খাদ্যরসিকের মন মজাতে সমর্থ হবে, তা নিয়ে সে নিস্পৃহ থাকতে পারে আদৌ, স্রেফ অঙ্ক জানে বলে? এমন উৎকট গুমোর আর যারই থাক, শ্রীপ্রকৃতিকুমার শূরের নেই।
          ক্লাস ফাইভের হাফ ইয়ার্লির পর সেই যে তিনি এলেন তাঁর খোকার কাছে, ক্রমে মাস্টারমশাইয়ের স্বভাবসিদ্ধ গণ্ডি টপকে হয়ে উঠলেন গোটা পরিবারের পরম শুভানুধ্যায়ী। বাবার দুটো হার্ট অ্যাটাক, মা হাসপাতাল ডাক্তার নিয়ে ব্যতিব্যস্ত, শ্রীপ্রকৃতিকুমার শূর নিঃশব্দে ঘড়ির কাঁটা ধরে ন্যস্ত দায়িত্ব শুধু পালন করেননি, সম্পূর্ণ অযাচিত ভাবেই নতুন নতুন দায়িত্ব ঘাড়ে তুলে নিয়ে খোকাকে তরিয়ে দেওয়ার ভার নিয়েছেন। এরই কাছাকাছি সময়ে দেখেছি ‘সাত পাকে বাঁধা’র সেই চোয়াল-শক্ত মাইনে-করা মাস্টারকে, শাশুড়ি ঠাকরুন যাকে গুণ্ডা বলে নির্ভুল শনাক্ত করেছিলেন। নাঃ, মাইনে দিয়ে এতটা পাওয়া যায় না ছায়া দেবী!
          পারিবারিক বিপর্যয়েই শুধু নয়, আরোগ্যের সময়েও মাস্টারমশাই আমাদের হাত ধরেছেন। তাঁরই উদ্যোগে প্রথম সমুদ্র দর্শন, দক্ষিণ ভারত ভ্রমণ, ঝাড়গ্রাম রাজবাড়িতে থাকা, হিমাচল প্রদেশ দেখা। তাঁর সূত্রেই পরিচয় স্বর্ণ মন্দিরে সেই শিখ ভদ্রলোকটির সঙ্গে, ১৯৮৪ সালের তেইশ বছর পরেও বাবাকে দেখে যিনি বলে উঠবেন, ‘আপ জ্যোতি বাসুজিকা বঙ্গাল সে আয়ে হ্যাঁয় না?’ আর বাবা, আমার দিকে চেয়ে একটু মুচকি হাসবে। কেউ কেউ সহজেই ভোলে। ঠিক।
          দক্ষিণ ভারতেরই কোনও একটি স্টেশনে, রাত্তির বেলা বসে আছি। রেল পুলিশের চোখ এড়িয়ে যতদূর সম্ভব ধূমপান করা গেছে, বাবার সম্মতিক্রমে। কলেজে পড়ি বলে কথা। হাতে কোনও কাজ নেই, বইপত্র পড়া শেষ। ট্রেনের দেখা নেই। সেই প্রায় জনমানবশূন্য স্টেশনে, খাতা কলম দিয়ে মাস্টারমশাইকে বললাম, কিছু শক্ত শক্ত ফ্যাক্টরের অঙ্ক দিন না। বলার অপেক্ষা। কলম বেয়ে হুড়মুড় করে নেমে এল খান দশেক বাছাই করা চিজ। কাজে লেগে গেলাম। অপাঙ্গে দেখলাম, এই বিচিত্র প্রস্তাবে, আমার সেই আহত ও অবসৃত বাবার মুখে এক স্বর্গীয় হাসি ফুটে উঠেছে, এত দিনে।
          শ্রীপ্রকৃতিকুমার শূরের নির্দেশে সংগৃহীত অঙ্কের বই এখন খোকাকে দিই। সংশোধনের সময় সমাধানের ভাষা শোধরাতে ত্রুটি করি না। কালকেই দুটো সমীকরণের ডান দিকে এক আর দুই লিখে গোল্লা পাকিয়ে বলছিলাম – এক ও দুই একত্রে বিবেচনা করে পাই …। ওই সেই শব্দ – বিবেচনা – শ্রীপ্রকৃতিকুমার শূরের দান। যা কলমে আসে, কাজের বেলায় মনে পড়ে না সর্বদা।
          একটু বিবেচনা। অপরের কথা শোনার সময়, চুপ করে যাওয়াই যেখানে সংগত সেখানে মুখর হয়ে ওঠার আগে, অথবা
নিদান হাঁকার সময় – এই বিবেচনাই বাঁচিয়ে দিতে পারে এখনও। ছায়া দেবীদের উপস্থিতি সত্ত্বেও।
          ট্রেন আসতে এখনও কিছু দেরি। খাতায়, উৎপাদকে বিশ্লেষণ। সামনে, শ্রীপ্রকৃতিকুমার শূর।

দেখা হয়েছে: বার

5 5 votes
Article Rating
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x