
শিল্পী: কাতসুশিকা হোকুসাই
আচার্য হরিপদ শাসমল
স্বপন পান্ডা
উনিশ শ চুয়াত্তর। বাহান্ন বছর আগে, অজ পাড়াগাঁ থেকে মুখচোরা, সংকোচে সদা-বিহ্বল এক কিশোর, ক্লাস নাইনে ভর্তিহল এগরা ঝাটুলাল উচ্চবিদ্যালয়ে। শহর থেকে দু-আড়াই মাইল দূরের গ্রামদেশ থেকে, বুকে বইখাতা চেপে খালি পায়ে সে হেঁটে আসে।অবাক-বিস্ময়ে দেখে, কৃষ্ণসায়র দীঘির রহস্যময় গভীর কালো জলের ওপারে ইংরেজি লম্বা বিশাল এল-এর মতো ছড়িয়ে, দাঁড়িয়ে আছে শ্বেতশুভ্র ঝাটুলালের ভবন। গেট দিয়ে ঢুকে লাল মোরামের রাস্তা সোজা চলে গেছে ইস্কুল-দালানে। ক্লাস শুরু হলে, বন্ধুরা বলাবলি করে, কাল এইচ এসের ক্লাস। অবশেষে তিনি এলেন। বাংলার প্রবাদ-প্রতিম শিক্ষক হরিপদ শাসমল।
শহরের ছেলেরা বলে এইচ এস; আমরা বলি হরিপদ স্যার। তখনও দেখা হয়নি, অথচ তাঁকে নিয়ে গল্পগাছা কত না শোনা হয়ে গেল! বাড়ি তাঁর কাঁথি-রামনগর এলাকার কালিন্দী। ‘কাইগো বাবুহর, আমি হরিপদ আসছি’ বলেই এগরা শহরের, শহর-সংলগ্ন যে-কোনও জনপদের যে-কোনও বাড়ির দাওয়ায় মাদুর টেনে বসে পড়েন। সদরে অন্তঃপুরে এই ‘নিরহং’ শিক্ষকের হঠাৎ আবির্ভাবে পরিবারে, মহল্লায় আলোড়ন জাগে। শুনতে পাই, নোয়াখালি না কোথায় যেন, দাঙ্গার সময়, লেখাপড়া ছেড়ে দিয়ে গান্ধিজির সঙ্গে শান্তিযাত্রায় চলে গিয়েছিলেন। ফিরে এসে লেখাপড়া শেষ করে নানা জায়গায় ঘুরে থিতু হয়েছেন এগরায়। গত পনেরো বছরে আর কোথাও যাননি, একেবারে জড়িয়ে পড়েছেন। এগরায় কলেজ গড়ে ওঠার সময় দোরে দোরে ঘুরে অর্থসংগ্রহ করেছেন, বিনা দক্ষিণায় কলেজে সাহিত্যের ক্লাসও নিয়েছেন গড়ে ওঠার কালে।
গেরুয়া পাঞ্জাবি খদ্দরের ধুতিতে নাতিদীর্ঘ গৌরবর্ণ, একটু গোলগাল মানুষটি স্কুলের দক্ষিণ-পূর্বকোণে ছাত্রাবাসে নিজের ঘরটি থেকে বেরিয়ে, স্টাফ রুম হয়ে, ধীর পায়ে উঠে এলেন দোতলায়, ছেলেরা বারান্দা থেকে হুড়মুড়িয়ে ঢুকতে থাকে ক্লাসে… খুবই কি কড়া ধাঁচের মাস্টারমশাই নাকি! গ্রাম্য কিশোরের সব ভয় সব সংকোচ মাত্র পঁয়তাল্লিশ মিনিটের কবিতার ক্লাসে উবে যায়। সনেট কাকে বলে, কী হয় তার ধরন-গড়ন, এসব ভূমিকার পর শুরু হয়, মধুসূদনের ‘হে বঙ্গ ভান্ডারে তব…’। ‘যা রে বাছা’ বলে যখন বঙ্গজননী, কবিকে স্নেহময় নির্দেশ দেন, এই জায়গাটিতে তাঁর কণ্ঠে ভর করেন স্বয়ং বঙ্গজননী, আবার ‘পালিলাম আজ্ঞা সুখে’-তে ফেরা মাত্র এক অকৃতী অধম সন্তানের গলায় জাগিয়ে তোলেন গভীর আক্ষেপ ও অশেষ প্রত্যয়ের সুর। সেই প্রথম কবিতাকে ভালোবাসা, সেই প্রথম মধুসূদনের সঙ্গে বন্ধুসম্মিত আলাপ। দু বছর পর তিনিই মধুক্ষরা পদাবলীর অন্দরে নিয়ে গেলেন, ‘তাতল সৈকতে বারি বিন্দুসম সুত মিত রমণী সমাজে’, শোনালেন মৈথিল কোকিলের জীবনপ্রান্তের সঘন হাহাকার। দিনে দিনে তিনি এমন কত কবিতার ভেতর মহলে হাত ধরে ধরে নিয়ে যেতে লাগলেন, কবিতার শব্দে শব্দে এত ‘ঘনযামিনী’র আলো ছড়িয়ে আছে! তাঁর ক্লাসে না বসলে জানাই হত না।
রবীন্দ্রনাথের দাদাঠাকুরের মতো কচি-কাঁচাদের মাথা ঘুরিয়ে মাতিয়ে মজিয়ে দেবার ব্রত ছিল তাঁর। কৃষ্ণসায়র দীঘির পাড় ধরে হেঁটে আসছেন, সামনে পেছনে যেন পঞ্চকের দল! স্কুলের মহাপঞ্চকের উচ্চাসনে যিনিই বসুন না কেন, খাপছাড়া, আপনহারা মানুষটিকে কেউ কখনও শৃঙ্খলে বাঁধবার চেষ্টাও করেননি। সন্ধ্যায় ক্লাসরুম ছাপিয়ে ছেলেরা এসে পড়ে তাঁর ঘরে। তাদের হাবিজাবি কাঁচা লেখার বদলে দেন শব্দ, বানান ঠিক করে দেন, হোঁচট খাওয়া ছন্দকে দাঁড় করিয়ে দেন। কীভাবে যেন সবাই জেনে যাই, নিভৃতে তিনি কৃষ্ণানন্দ ব্রহ্মচারী নামে কবিতাও লেখেন, কবি তিনি! মনে পড়ে, একটি কবিতায় স্যার চেয়েছিলেন, রঞ্জন ও নন্দিনীর আবির্ভাব। কারণ, ‘আমরা’ আজও –
রঞ্জন হয়ে পারিনি রাঙাতে মাটি ও মানব মন,
নন্দিনী নাই ধরিত্রী তাই তুলিতেছে ক্রন্দন।।
তাঁর আক্ষেপ:
বিভেদের ছোরা রক্তে হাসিছে
দেশের এ মাটি ঘুমে ভিজে আছে
পঙ্ক্তিগুলি আজও যে কতখানি প্রাসঙ্গিক!
হরিপদ স্যারের সঙ্গে শেষ দেখা উনিশ শ আশি-তে, ঠিক ছেচল্লিশ বছর আগে। পাঁচ বছর পর, পঁচাশি সালে তিনি চলে গেলেন। মনের মধ্যে আজও বয়ে নিয়ে চলেছি ‘আচার্যর ভদ্রাসন’। সবার জন্য উন্মুক্ত তাঁর দীক্ষাসত্রে, কোথাও ছিল না গুরুগিরি বা হুকুমনামা; সকলই বন্ধুর মতো, সখার মতো … সারাজীবনে, আচার্যর সঙ্গে তুলনা করব এমন কাউকে আর দেখলাম কই!
দেখা হয়েছে: ০ বার